দাজ্জাল এবং ইয়াজুজ-মাজুজ বর্তমানে কোথায় আছে? ইসলামিক স্কলারদের মতে, মানুষ মহাকাশ সম্পর্কে যতটুকু জেনেছে, মাটির নিচ বা মহাসমুদ্রের গভীরতা সম্পর্কে তার এক শতাংশও জানে না। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দাজ্জাল এবং ইয়াজুজ-মাজুজকে আমাদের দৃষ্টিসীমার আড়ালে, অন্য ডাইমেনশনে বা অন্য কোনো জমিনে রেখেছেন, যা বিজ্ঞান এখনো ভেদ করতে পারেনি।
কয়েকদিন পরপরই আমরা খবর পাই, নাসা (NASA) মঙ্গল গ্রহে রোভার পাঠিয়েছে কিংবা মানুষ মহাকাশের নতুন কোনো গ্যালাক্সির সন্ধান পেয়েছে। কিন্তু আপনি কি জানেন, যে মানুষ কোটি কোটি কিলোমিটার দূরের গ্রহের ছবি তোলে, সেই মানুষ মাটির মাত্র ১২ কিলোমিটারের বেশি নিচে যেতে পারেনি?
হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছেন! বিজ্ঞান যেখানে মাটির নিচে বা সমুদ্রের গভীর অন্ধকারে অসহায়, সেখানে আমরা কীভাবে দাবি করি যে পুরো পৃথিবী আমাদের কন্ট্রোলে? আর এই অজানার মধ্যেই লুকিয়ে আছে ইসলামী এস্ক্যাটোলজি বা শেষ জামানার সবচেয়ে বড় রহস্য— দাজ্জাল এবং ইয়াজুজ-মাজুজের অবস্থান।
এই আর্টিকেল থেকে আপনি যা যা জানতে পারবেন:
- নাসা ও বিজ্ঞানীদের সীমাবদ্ধতা এবং পৃথিবীর অজানা রহস্য।
- দাজ্জাল এবং ইয়াজুজ-মাজুজ কোথায় লুকিয়ে আছে তার যৌক্তিক ব্যাখ্যা।
- সূরা কাহাফের ৪টি ব্যতিক্রমী ঘটনা কীভাবে আমাদের দাজ্জালের ফিতনা থেকে বাঁচাবে।
- ইয়াজুজ-মাজুজের প্রকৃত সংখ্যা কত এবং তারা কীভাবে ধ্বংস হবে।
চলুন, বিজ্ঞান এবং কোরআন-হাদিসের আলোকে মহাবিশ্বের এই অজানা রহস্যের গভীরে প্রবেশ করি।
বিজ্ঞানীদের সীমাবদ্ধতা: আমরা আসলে কতটা জানি?
আমরা মনে করি মানুষ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে অনেক এগিয়ে গেছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, মানুষের জানার পরিধি খুবই সীমিত।
আমেরিকা, রাশিয়া এবং চীনের বিজ্ঞানীরা মিলে আজ পর্যন্ত মাটির নিচে মাত্র ১২ কিলোমিটার পর্যন্ত খনন করতে সক্ষম হয়েছেন। এর নিচে কোনো যন্ত্রই আর কাজ করে না; অত্যধিক তাপে সবকিছু পুড়ে ছাই হয়ে যায়। ঠিক একইভাবে, মহাসমুদ্রের এমন অনেক গভীর খাদ বা ট্রেঞ্চ রয়েছে যেখানে আজ পর্যন্ত কোনো সাবমেরিন, ইন্টারনেট নেটওয়ার্ক বা নেভিগেশন সিস্টেম পৌঁছাতে পারেনি।
যেখানে মানুষ নিজের পৃথিবীর মাটির নিচে বা সমুদ্রের তলদেশ সম্পর্কে বিন্দুমাত্র জ্ঞান রাখে না, সেখানে “দাজ্জাল কোথায় লুকিয়ে আছে তা স্যাটেলাইটে কেন দেখা যায় না”— এমন প্রশ্ন করাটা চরম বোকামি ছাড়া আর কিছুই নয়।
দাজ্জাল এবং ইয়াজুজ-মাজুজ কোথায় আছে?
ইসলামিক স্কলার এবং কোরআনের আলোকে দাজ্জাল ও ইয়াজুজ-মাজুজের অবস্থান সম্পর্কে ৩টি চমৎকার ব্যাখ্যা দেওয়া যায়:
- ১. ডাইমেনশন বা ভিন্ন জগৎ: যেমন ধরুন, ফেরেশতা বা জিনরা আমাদের চারপাশে মসজিদে, রাস্তায় আছে, কিন্তু আমরা তাদের দেখতে পাই না। কুকুর বা সাপ পৃথিবীকে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে (আলাদা ডাইমেনশনে) দেখে। আল্লাহ চাইলে দাজ্জাল এবং ইয়াজুজ-মাজুজকেও আমাদের দৃষ্টিসীমার আড়ালে রাখতে পারেন।
- ২. অজানা স্থান: পৃথিবীর এমন অনেক স্থান রয়েছে, যা আজও মানুষের অজানা। আল্লাহ চাইলে তাদেরকে পৃথিবীরই কোনো লুকায়িত অঞ্চলে বন্দি করে রাখতে পারেন।
- ৩. অন্য জমিন (Parallel Earth): কোরআনে সাত আসমান এবং সাত জমিনের কথা বলা হয়েছে। সাত আসমান যত বড়, সাত জমিনও তত বড় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আল্লাহ চাইলে তাদেরকে অন্য কোনো জমিনেও সুরক্ষিত রাখতে পারেন।
দাজ্জালের ফিতনা থেকে বাঁচার উপায়
দাজ্জালের ফিতনা পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ ফিতনা। এই ফিতনা থেকে বাঁচার জন্য রাসূল (সা.) সূরা কাহাফ পড়তে বলেছেন। কেন? কারণ এই সূরায় ৪টি ব্যতিক্রমী ঘটনা রয়েছে:
১. আসহাবে কাহাফ: যারা ঈমান বাঁচাতে গুহায় আশ্রয় নিয়েছিলেন এবং সময়ের আপেক্ষিকতায় (Time Relativity) ৩০৯ বছর ঘুমিয়ে ছিলেন।
২. দুই ভাইয়ের বাগান: সম্পদ ও অহংকারের পতন কীভাবে এক রাতেই ঘটে, তার প্রমাণ।
৩. মুসা (আ.) এবং খিজির (আ.)-এর ঘটনা: পৃথিবীতে সবকিছুর পেছনের কারণ মানুষের লজিক দিয়ে বোঝা সম্ভব নয়।
৪. জুলকারনাইন (আ.): যিনি ইয়াজুজ-মাজুজকে বিশাল দেয়াল দিয়ে বন্দি করেছিলেন।
এই ৪টি ঘটনার সারমর্ম হলো, পৃথিবীতে দাজ্জাল যখন অদ্ভুত সব মাজেজা (যেমন- মৃতকে জীবিত করা, বৃষ্টি নামানো) দেখাবে, তখন মুমিনরা বুঝতে পারবে যে এগুলো আল্লাহর দেওয়া পরীক্ষা, যেমনটি খিজির (আ.)-এর ঘটনায় ঘটেছিল।
ইয়াজুজ-মাজুজের ভয়াবহ সংখ্যা: হাদিসের আলোকে বিশ্লেষণ
ইয়াজুজ-মাজুজ (Gog and Magog) নিয়ে অনেকের ভুল ধারণা রয়েছে। কেউ বলে চীনারা ইয়াজুজ-মাজুজ, কেউ বলে রাশিয়ান বা ইসরাইলিরা ইয়াজুজ-মাজুজ। এগুলো সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।
হাদিসের ভাষ্যমতে, ইয়াজুজ-মাজুজ হলো আদম (আ.)-এর সন্তান। কিন্তু তাদের সংখ্যা এত বিশাল যে আপনি কল্পনাও করতে পারবেন না।
রাসূল (সা.) বলেছেন, কিয়ামতের দিন আদমের সন্তানদের প্রত্যেক ১০০০ জনের মধ্যে ৯৯৯ জন জাহান্নামে যাবে। সাহাবীরা এই কথা শুনে হতাশ হয়ে পড়লে তিনি বলেন, এই ৯৯৯ জনের বিশাল অংশই হলো ইয়াজুজ-মাজুজ!
হিসাবটা কেমন?
আদম (আ.) থেকে কিয়ামত পর্যন্ত যত মানুষ পৃথিবীতে আসবে, ইয়াজুজ-মাজুজের সংখ্যা তার কয়েক শত গুণ বেশি! এরা যখন পাহাড় থেকে নেমে আসবে, তখন তাদের প্রথম দল ‘সি অফ গ্যালিলি’ বা টাইবেরিয়া লেকের পুরো পানি পান করে শুকিয়ে ফেলবে।
ঈসা (আ.)-এর অবতরণ এবং ইয়াজুজ-মাজুজের ধ্বংস
ইসলামিক এস্ক্যাটোলজিতে শেষ জামানার ঘটনাপ্রবাহ অত্যন্ত সুশৃঙ্খল। চলুন ধাপে ধাপে জেনে নিই:
- ধাপ ১ (দাজ্জালের আবির্ভাব): সারা বিশ্বে মুসলমানদের চরম বিজয়ের মুহূর্তে রাগের বশবর্তী হয়ে দাজ্জাল আত্মপ্রকাশ করবে।
- ধাপ ২ (ঈসা আ.-এর অবতরণ): আল্লাহ ঈসা (আ.)-কে পাঠাবেন এবং তার হাতে দাজ্জাল নিহত হবে।
- ধাপ ৩ (ইয়াজুজ-মাজুজের আক্রমণ): দাজ্জালের পর ইয়াজুজ-মাজুজ বের হবে। এদের মোকাবেলা করার ক্ষমতা মুমিনদের থাকবে না। ঈসা (আ.) মুমিনদের নিয়ে তুর পাহাড়ে আশ্রয় নেবেন।
- ধাপ ৪ (ইয়াজুজ-মাজুজের ধ্বংস): ঈসা (আ.)-এর দোয়ার কারণে আল্লাহ এক বিশেষ রোগ (পোকা) পাঠাবেন, যার ফলে কোটি কোটি ইয়াজুজ-মাজুজ এক সেকেন্ডের মধ্যে মারা যাবে।
- ধাপ ৫ (পৃথিবী পরিষ্কার): বিশেষ পাখি এসে তাদের লাশগুলো সাগরে বা দূরবর্তী স্থানে ফেলে দেবে এবং বৃষ্টি এসে পৃথিবীকে পরিষ্কার করবে।
আমাদের প্রস্তুতি কেমন হওয়া উচিত?
বাংলাদেশের অনেক মানুষ মনে করেন, দাজ্জাল আসলে তখন ঈমান আনলেই হবে। এটি একটি মারাত্মক ভুল!
- অবৈধ উপার্জনের মোহ: যার পকেটে এক টাকাও হারাম ইনকাম আছে, সে দাজ্জালের ফিতনায় পড়বে। দাজ্জাল এসে যখন খাবারের স্তূপ দেখাবে, তখন ঈমান দুর্বল ব্যক্তিরা তার কাছে মাথা নত করবে।
- মৃত্যুই আপনার কিয়ামত: দাজ্জাল, ইমাম মাহদী বা ঈসা (আ.)-কে দেখার জন্য অপেক্ষা করার দরকার নেই। আপনি মারা গেলেই আপনার কিয়ামত শুরু হয়ে যাবে। কবরের আজাব, জান্নাত-জাহান্নাম সবই আপনি দেখতে পাবেন। তাই আসল ফোকাস হওয়া উচিত বর্তমান আমলের ওপর।
বহুল জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
দাজ্জাল কি বর্তমানে পৃথিবীতে আছে?
হাদিস (তামিম দারী রা.-এর ঘটনা) অনুযায়ী, দাজ্জাল বর্তমানে কোনো একটি অজানা দ্বীপে শিকল দিয়ে বন্দি অবস্থায় রয়েছে। আল্লাহর হুকুম হলে নির্দিষ্ট সময়ে সে আত্মপ্রকাশ করবে।
খিজির (আ.) কি এখনো জীবিত আছেন?
অনেক গবেষকের মতে, খিজির (আ.) পৃথিবীর সাধারণ লজিকের বাইরের একজন মানুষ। তিনি জীবিত আছেন কিনা তা নিশ্চিত করে বলা যায় না, এটি সম্পূর্ণ আল্লাহর ইলমের অধীন।
সি অফ গ্যালিলি কোথায় অবস্থিত?
সি অফ গ্যালিলি বা লেক অফ টাইবেরিয়া বর্তমানে ইসরাইল ও ফিলিস্তিনের সীমানায় অবস্থিত, যার পানি ইয়াজুজ-মাজুজ পান করে শুকিয়ে ফেলবে।
ইয়াজুজ-মাজুজ কারা?
তারা আদম (আ.)-এরই বংশধর। তবে তাদের বৈশিষ্ট্য এবং সংখ্যা সাধারণ মানুষের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা এবং ভয়ংকর।
নাসা কি সত্যিই চাঁদে গিয়েছিল?
এটি নিয়ে অনেক তর্ক-বিতর্ক রয়েছে। তবে ইসলামিক দৃষ্টিকোণ থেকে, মানুষ মহাকাশে যতই যাক না কেন, আল্লাহর সৃষ্টিজগতের বিশালতার তুলনায় তা কিছুই নয়।
সূরা কাহাফ কখন পড়া উচিত?
হাদিস অনুযায়ী, প্রতি জুমাবারে (শুক্রবার) সূরা কাহাফ পড়া মুস্তাহাব। এটি দাজ্জালের ফিতনা থেকে রক্ষা পাওয়ার একটি বড় হাতিয়ার।
কিয়ামতের আগে কি মুসলমানদের বিজয় হবে?
হ্যাঁ, দাজ্জাল বের হওয়ার ঠিক আগেই মুসলমানরা ইমাম মাহদীর নেতৃত্বে সারা বিশ্বে বিজয় লাভ করবে।
দাজ্জালের কাছে কি জাদু থাকবে?
দাজ্জাল জাদু নয়, বরং আল্লাহর দেওয়া কিছু বিশেষ ক্ষমতা (মাজেজা) নিয়ে আসবে, যা দিয়ে সে বৃষ্টি নামাবে, মৃতকে জীবিত করবে এবং মানুষকে পরীক্ষা করবে।
শেষকথা
বিজ্ঞান আমাদের অনেক কিছু দিয়েছে, কিন্তু এর মানে এই নয় যে মহাবিশ্বের সব রহস্য মানুষের হাতের মুঠোয় চলে এসেছে। দাজ্জাল এবং ইয়াজুজ-মাজুজের অবস্থান প্রমাণ করে যে আল্লাহর সৃষ্টিজগত কত বিশাল এবং আমাদের জ্ঞান কত সীমিত।
শেষ জামানার এই ফিতনাগুলো থেকে বাঁচতে হলে আমাদের নতুন কোনো নবীর প্রয়োজন নেই; আমাদের কাছে কোরআন এবং রাসূল (সা.)-এর সুন্নাহ রয়েছে। হালাল উপার্জনে চলা, সূরা কাহাফের ওপর আমল করা এবং ঈমানকে শক্ত রাখাই হলো ফিতনা থেকে বাঁচার একমাত্র পথ।
আধুনিক বিজ্ঞান কি কোনোদিন মাটির নিচের বা মহাসমুদ্রের এই অজানা রহস্য ভেদ করতে পারবে? নাকি এগুলো কিয়ামত পর্যন্ত আল্লাহর নিজস্ব রহস্যাবৃতই থেকে যাবে? আপনার চিন্তাভাবনা আমাদের কমেন্ট বক্সে শেয়ার করুন। ইসলামী জ্ঞান ও সাইন্স বিষয়ক এমন সব চমৎকার আর্টিকেল পেতে আমাদের ওয়েবসাইট নিয়মিত ভিজিট করুন!
তথ্যসূত্র: সহীহ বুখারী, মুসলিম শরিফের হাদিস, সূরা কাহাফের তাফসির এবং ইসলামিক স্কলার শায়খ আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রাজ্জাকের জুমার খুতবার বিশ্লেষণ।