‘নিউ গাজা প্ল্যান’ হলো যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার জামাতা জ্যারেড কুশনারের প্রস্তাবিত একটি পরিকল্পনা, যার মাধ্যমে যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজাকে একটি আধুনিক স্মার্ট সিটিতে রূপান্তর করা হবে। পরিকল্পনায় ১৮০টি সুউচ্চ টাওয়ার, পর্যটন কেন্দ্র, বিমানবন্দর এবং শিল্পাঞ্চল গড়ার কথা বলা হয়েছে। তবে সমালোচকদের মতে, এই পরিকল্পনায় গাজার স্থানীয় ফিলিস্তিনিদের মতামত ও অধিকারকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে এটিকে একটি রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়িক প্রজেক্টে পরিণত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
বিশ্ব রাজনীতির মঞ্চে আবারও আলোচনায় ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে এবার কোনো নির্বাচন বা রাজনৈতিক বিতর্ক নয়, বরং ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকা নিয়ে তার নতুন এক মাস্টারপ্ল্যান বা ‘নিউ গাজা প্ল্যান’ (New Gaza Plan) নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে। সম্প্রতি বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে এই পরিকল্পনার বিস্তারিত তুলে ধরেন ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার। চলুন জেনে নেওয়া যাক, কী আছে এই পরিকল্পনায় এবং কেন এটি নিয়ে এত বিতর্ক।
নিউ গাজা প্ল্যান আসলে কী?
সহজ কথায়, এটি গাজাকে পুনর্গঠন করে একটি অত্যাধুনিক শহরে পরিণত করার নকশা। ভিডিও রিপোর্ট অনুযায়ী, এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো গাজার ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে সেখানে আবাসন, পর্যটন এবং বাণিজ্যের কেন্দ্র গড়ে তোলা।
পরিকল্পনার প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ:
- আধুনিক আবাসন: ২১ লাখ বাসিন্দার জন্য নতুন পরিকল্পিত শহর, যেখানে ১৮০টি সুউচ্চ টাওয়ার ব্লক বা স্কাইস্ক্র্যাপার থাকবে।
- জোন ভিত্তিক উন্নয়ন: পুরো শহরকে আবাসিক, কৃষি এবং শিল্প—এই তিন ভাগে ভাগ করা হবে।
- পর্যটন কেন্দ্র: ভূমধ্যসাগরের উপকূলকে কেন্দ্র করে গড়ে তোলা হবে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন স্পট বা টুরিস্ট হাব।
- যোগাযোগ ব্যবস্থা: নতুন সমুদ্রবন্দর, বিমানবন্দর এবং মিশর ও ইসরায়েলের সাথে সংযুক্ত আধুনিক বর্ডার ক্রসিং বা চেকপয়েন্ট তৈরি হবে।
যেভাবে বাস্তবায়িত হবে এই মেগাপ্রজেক্ট
জ্যারেড কুশনারের ভাষ্যমতে, এই প্রজেক্টটি চার ধাপে সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে।
- ধাপ ১ – পরিষ্কারকরণ: প্রথমেই গাজার প্রায় ৬০ মিলিয়ন টন ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ শুরু হবে। রাফা এলাকা থেকে এই কাজ শুরু করার কথা বলা হয়েছে।
- ধাপ ২ – নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ: বিনিয়োগকারীদের আস্থায় আনতে হামাসের পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ এবং কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে। কুশনার উল্লেখ করেছেন, নিরাপত্তা ছাড়া কেউ এখানে বিনিয়োগ করবে না।
- ধাপ ৩ – অবকাঠামো উন্নয়ন: ডাটা সেন্টার, পার্ক, স্টেডিয়াম এবং অন্যান্য নাগরিক সুযোগ-সুবিধা নির্মাণ।
- ধাপ ৪ – আন্তর্জাতিক অর্থায়ন: ট্রাম্পের নেতৃত্বে ‘বোর্ড অফ পিস’ (Board of Peace) গঠন করা হবে। এর সদস্য প্রতিটি দেশকে ১ বিলিয়ন ডলার করে ফান্ড দেওয়ার শর্ত দেওয়া হয়েছে।
ফিলিস্তিনিদের ভূমিকা ও বিতর্ক
এই পরিকল্পনার সবচেয়ে বিতর্কিত দিক হলো ফিলিস্তিনি জনগণের অংশগ্রহণ। যমুনা টিভির রিপোর্ট অনুযায়ী, এই পুরো প্রক্রিয়ায় ফিলিস্তিনিদের মতামত বা ভূমিকাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা হয়েছে।
- রিয়েল এস্টেট দৃষ্টিভঙ্গি: ট্রাম্প গাজাকে একটি ভূ-রাজনৈতিক সমস্যা হিসেবে না দেখে বরং একটি আকর্ষণীয় ‘রিয়েল এস্টেট’ বা আবাসন ব্যবসার জায়গা হিসেবে দেখছেন। তিনি আগেই গাজার উপকূলীয় এলাকা নিয়ে তার ব্যবসায়িক আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছিলেন।
- উচ্ছেদের আশঙ্কা: সমালোচকরা আশঙ্কা করছেন, এই আধুনিকায়নের নামে গাজার মূল বাসিন্দাদের উচ্ছেদ করে তাদের নিজস্ব ভূমি থেকে বঞ্চিত করা হতে পারে।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
১. নিউ গাজা প্ল্যানে কি ফিলিস্তিনিরা তাদের বাড়ি ফেরত পাবে?
এখন পর্যন্ত প্রকাশিত পরিকল্পনায় ফিলিস্তিনিদের পুনর্বাসনের চেয়ে নতুন অবকাঠামো ও ব্যবসায়িক জোন তৈরির ওপর বেশি জোর দেওয়া হয়েছে। স্থানীয়দের মালিকানা বা ফেরার অধিকার নিয়ে স্পষ্ট কিছু বলা হয়নি, যা উদ্বেগের কারণ।
২. এই প্রজেক্টের টাকা কে দেবে?
ট্রাম্পের প্রস্তাবিত ‘বোর্ড অফ পিস’-এর সদস্য রাষ্ট্রগুলো এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের মাধ্যমে তহবিল সংগ্রহ করা হবে। প্রতিটি সদস্য দেশকে ১ বিলিয়ন ডলার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
৩. হামাস কি এই পরিকল্পনা মেনে নিয়েছে?
না। পরিকল্পনায় হামাসের নিরস্ত্রীকরণকে প্রধান শর্ত হিসেবে রাখা হয়েছে এবং তাদের ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে উল্লেখ করে আগামী ২০ বছরের জন্য তাদের প্রভাবমুক্ত গাজা গড়ার কথা বলা হয়েছে।
৪. বাংলাদেশিদের জন্য এই সংবাদের গুরুত্ব কী?
বাংলাদেশ বরাবরই ফিলিস্তিনিদের অধিকারের পক্ষে। ট্রাম্পের এই পরিকল্পনা যদি ফিলিস্তিনিদের স্বার্থ ক্ষুণ্ন করে, তবে তা মুসলিম বিশ্ব এবং বাংলাদেশের মানুষের আবেগে আঘাত করতে পারে। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে পরিবর্তন আসলে তা বাংলাদেশের শ্রমবাজার ও অর্থনীতিতেও পরোক্ষ প্রভাব ফেলতে পারে।
পরিশেষে
ট্রাম্পের ‘নিউ গাজা প্ল্যান’ কাগজে-কলমে একটি স্বপ্নের শহরের নকশা হলেও, এর মানবিক ও রাজনৈতিক দিকগুলো অত্যন্ত জটিল। ফিলিস্তিনি মানুষের অধিকার রক্ষা করে এই উন্নয়ন হবে, নাকি এটি আরেকটি দখলদারিত্বের নতুন মোড়ক সেটাই এখন দেখার বিষয়।