সহকারী রিটার্নিং অফিসার এর কাজ কি?

নির্বাচন কমিশনের অধীনে একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন পরিচালনার ক্ষেত্রে সহকারী রিটার্নিং অফিসার (Assistant Returning Officer বা ARO) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। সাধারণত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জেলা প্রশাসক (DC) রিটার্নিং অফিসার হিসেবে এবং উপজেলা নির্বাহী অফিসার (UNO) বা উপজেলা নির্বাচন অফিসার সহকারী রিটার্নিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

আপনি যদি জানতে চান একজন সহকারী রিটার্নিং অফিসারের মূল দায়িত্ব, ক্ষমতা এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় তার ভূমিকা কী, তবে এই আর্টিকেলটি আপনার জন্য।

সহকারী রিটার্নিং অফিসার কে?

সহকারী রিটার্নিং অফিসার হলেন এমন একজন নির্বাচনী কর্মকর্তা, যিনি রিটার্নিং অফিসারের তত্ত্বাবধানে নির্দিষ্ট নির্বাচনী এলাকা (সাধারণত উপজেলা পর্যায়) বা ভোটকেন্দ্রগুলোর নির্বাচন পরিচালনার সার্বিক দায়িত্ব পালন করেন। তার প্রধান কাজ হলো রিটার্নিং অফিসারকে সহায়তা করা, মনোনয়নপত্র গ্রহণ ও বাছাই প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়া, পোলিং অফিসার নিয়োগ দেওয়া, নির্বাচনের মালামাল কেন্দ্রে পৌঁছানো নিশ্চিত করা এবং ভোটগ্রহণের পর ফলাফল একীভূত করে রিটার্নিং অফিসারের কাছে প্রেরণ করা। তিনি নির্বাচনী আচরণবিধি ভঙ্গের বিষয়গুলোও তদারকি করেন।

সহকারী রিটার্নিং অফিসারের প্রধান কাজ ও দায়িত্বসমূহ

গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (RPO) ১৯৭২ এবং নির্বাচন পরিচালনা বিধিমালা অনুযায়ী সহকারী রিটার্নিং অফিসারের কাজগুলোকে আমরা প্রধানত ৩টি ভাগে ভাগ করতে পারি:

১. নির্বাচন পূর্ববর্তী দায়িত্ব (Pre-Election Duties)

নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে ভোটগ্রহণের আগের দিন পর্যন্ত একজন ARO-কে ব্যাপক প্রস্তুতি নিতে হয়:

  • জনবল নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ: প্রিসাইডিং অফিসার, সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার এবং পোলিং অফিসারদের প্যানেল প্রস্তুত করা এবং তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা।
  • ভোটকেন্দ্র প্রস্তুতকরণ: নির্ধারিত ভোটকেন্দ্রগুলো পরিদর্শন করা এবং সেগুলো ভোটগ্রহণের উপযোগী কি না তা নিশ্চিত করা।
  • মনোনয়নপত্র বিতরণ ও গ্রহণ: প্রার্থীদের মাঝে মনোনয়নপত্র বিতরণ করা এবং পূরণকৃত মনোনয়নপত্র গ্রহণ করে তা রিটার্নিং অফিসারের কাছে বা নির্দেশনা অনুযায়ী প্রাথমিক যাচাই-বাছাই করা।
  • প্রতীক বরাদ্দ ও প্রচার তদারকি: প্রার্থীদের প্রতীক বরাদ্দের পর নির্বাচনী আচরণবিধি মেনে তারা প্রচার চালাচ্ছেন কি না, তা মনিটরিং করা।
  • ব্যালট পেপার ও সামগ্রী ব্যবস্থাপনা: নির্বাচন কমিশন থেকে প্রাপ্ত ব্যালট পেপার, ব্যালট বাক্স, এবং অমোচনীয় কালিসহ অন্যান্য নির্বাচনী সামগ্রী নিরাপদে সংরক্ষণ ও কেন্দ্রে বিতরণের ব্যবস্থা করা।

২. নির্বাচন চলাকালীন দায়িত্ব (Election Day Duties)

ভোটের দিন সহকারী রিটার্নিং অফিসারের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ থাকে:

  • আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ: ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ, আনসার ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাথে সমন্বয় করা।
  • ভোটগ্রহণ পর্যবেক্ষণ: বিভিন্ন কেন্দ্র পরিদর্শন করা এবং সুষ্ঠুভাবে ভোটগ্রহণ চলছে কি না তা নিশ্চিত করা।
  • জরুরি সিদ্ধান্ত গ্রহণ: কোনো কেন্দ্রে সহিংসতা বা অনিয়ম হলে তাৎক্ষণিকভাবে ভোটগ্রহণ স্থগিত করার ক্ষমতা বা রিটার্নিং অফিসারকে রিপোর্ট করা।

৩. নির্বাচন পরবর্তী দায়িত্ব (Post-Election Duties)

ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পর তার কাজ হলো:

  • ফলাফল সংগ্রহ ও একীভূতকরণ: প্রিসাইডিং অফিসারদের কাছ থেকে ভোটকেন্দ্রের ফলাফল ও নির্বাচনী সামগ্রী বুঝে নেওয়া। এরপর উপজেলা বা নির্ধারিত এলাকার ফলাফল একীভূত (Consolidate) করে রিটার্নিং অফিসারের কাছে প্রেরণ করা।
  • ব্যয় বিবরণী জমা: নির্বাচন পরিচালনার খরচের হিসাব নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া।

সহকারী রিটার্নিং অফিসারের ক্ষমতা

অনেকেই রিটার্নিং অফিসার (RO) এবং সহকারী রিটার্নিং অফিসারের (ARO) ক্ষমতা গুলিয়ে ফেলেন। নিচে এর স্পষ্ট ধারণা দেওয়া হলো:

বিষয়রিটার্নিং অফিসার (RO)সহকারী রিটার্নিং অফিসার (ARO)
মনোনয়ন বাতিলমনোনয়নপত্র বাতিল করার পূর্ণ ক্ষমতা রাখেন।কেবল মনোনয়নপত্র গ্রহণ করতে পারেন, বাতিল করার চূড়ান্ত ক্ষমতা সাধারণত থাকে না (তবে নির্দেশ সাপেক্ষে ভিন্ন হতে পারে)।
ফলাফল ঘোষণাচূড়ান্তভাবে বিজয়ী প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেন (গ্যাজেট প্রকাশের জন্য)।শুধুমাত্র তার এলাকার (যেমন উপজেলার) ফলাফল ঘোষণা করে RO-এর কাছে পাঠান।
প্রার্থীতা প্রত্যাহারপ্রার্থীর প্রার্থিতা প্রত্যাহারের আবেদন গ্রহণ করেন।আবেদন গ্রহণ করে তা RO-এর কাছে প্রেরণ করেন।

বিশেষ দ্রষ্টব্য: রিটার্নিং অফিসারের অনুপস্থিতিতে বা তার লিখিত নির্দেশক্রমে সহকারী রিটার্নিং অফিসার রিটার্নিং অফিসারের সকল দায়িত্ব পালন করতে পারেন (শুধুমাত্র চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণা বাদে)।

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নসমূহ

১. সহকারী রিটার্নিং অফিসার কি নির্বাচন বাতিল করতে পারেন?

না, সহকারী রিটার্নিং অফিসার সম্পূর্ণ নির্বাচন বাতিল করতে পারেন না। তবে কোনো নির্দিষ্ট কেন্দ্রে ব্যাপক অনিয়ম বা সহিংসতা হলে তিনি সেই কেন্দ্রের ভোটগ্রহণ স্থগিত (Suspend) করতে পারেন এবং বিষয়টি দ্রুত নির্বাচন কমিশন বা রিটার্নিং অফিসারকে জানাতে পারেন।

২. সহকারী রিটার্নিং অফিসার হিসেবে কারা নিয়োগ পান?

বাংলাদেশে সাধারণত উপজেলা নির্বাহী অফিসার (UNO), উপজেলা নির্বাচন অফিসার বা সমমর্যাদার সরকারি কর্মকর্তাদের সহকারী রিটার্নিং অফিসার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। সিটি কর্পোরেশন এলাকায় জোনাল এক্সিকিউটিভ অফিসাররাও এই দায়িত্ব পেতে পারেন।

৩. নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনে ARO-এর ভূমিকা কী?

নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ পেলে ARO নির্বাচনী তদন্ত কমিটি বা এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটদের মাধ্যমে ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। তিনি প্রার্থীর বিরুদ্ধে কারণ দর্শানোর নোটিশ (Show Cause Notice) জারি করতে পারেন না, তবে রিটার্নিং অফিসারকে রিপোর্ট করতে পারেন।

শেষকথা

পরিশেষে বলা যায়, সহকারী রিটার্নিং অফিসার হলেন নির্বাচনী মাঠপর্যায়ের মূল সমন্বয়কারী। রিটার্নিং অফিসার জেলা পর্যায়ে থাকলেও তৃণমূল পর্যায়ে নির্বাচন সুষ্ঠু করার মূল দায়িত্বটি ARO-ই পালন করেন। লজিস্টিক সাপোর্ট থেকে শুরু করে ফলাফল একত্রীকরণ প্রতিটি ধাপে তাদের দক্ষতা ও নিরপেক্ষতা একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পূর্বশর্ত।

তথ্যসূত্র:

১. গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (Representation of the People Order), ১৯৭২

২. নির্বাচন পরিচালনা বিধিমালা, ২০০৮

৩. বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন হ্যান্ডবুক

Leave a Comment