এম এল এস এস (MLSS) পদের কাজ হলো সরকারি অফিসে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দৈনন্দিন কাজে সহায়তা করা। এই পদের আনুষ্ঠানিক নাম এখন “অফিস সহায়ক”। এম এল এস এস-এর প্রধান কাজের মধ্যে রয়েছে — অফিসের আসবাবপত্র পরিষ্কার ও সাজানো, ফাইল ও কাগজপত্র এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় পাঠানো, চা-নাশতা পরিবেশন করা, চিঠিপত্র বিতরণ এবং অফিসের ভেতরের সব ধরনের সহায়ক কাজ করা।
এম এল এস এস কী? পূর্ণ রূপ ও ইতিহাস
এম এল এস এস (MLSS) মানে হলো Member of Lower Subordinate Staff — বাংলায় “নিম্ন অধস্তন কর্মচারী সদস্য”। এটি বাংলাদেশ সরকারের চতুর্থ শ্রেণির একটি পদ।
ব্রিটিশ আমল থেকে সরকারি অফিসে পিয়ন, দফতরি, চাপরাশি, আর্দালি — এসব নামে এই পদটি পরিচিত ছিল। ২০১৪ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিপত্রের মাধ্যমে চতুর্থ শ্রেণির ৩৪টি পদের নাম পরিবর্তন করা হয়। এমএলএসএস, পিয়ন, দফতরি, চাপরাশি, আর্দালি — সবকিছুকে একত্রিত করে “অফিস সহায়ক” নামের একটি একক পদ তৈরি করা হয়।
তাই বর্তমানে সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে “এমএলএসএস” ও “অফিস সহায়ক” — দুটি নামই ব্যবহার করা হয়। মূলত এই দুটি একই পদ।
এম এল এস এস / অফিস সহায়ক পদের কাজ কী কী?
১. অফিসের ভেতরে সহায়তামূলক কাজ
- অফিসের আসবাবপত্র এবং রেকর্ডসমূহ সুন্দরভাবে বিন্যাস করা ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা।
- অফিসের ফাইল এবং কাগজপত্র নির্দেশ অনুযায়ী এক স্থান থেকে অন্য স্থানে বা অন্য অফিসে পৌঁছে দেওয়া।
- হালকা আসবাবপত্র অফিসের ভেতরে প্রয়োজন অনুসারে স্থানান্তর করা।
- অফিস কক্ষ, বারান্দা ও আশেপাশের জায়গা পরিষ্কার রাখা।
২. কর্মকর্তাদের সহায়তা করা
- কর্মকর্তাদের চা, নাশতা ও পানীয় পরিবেশন করা।
- কর্মকর্তার নির্দেশে চিঠিপত্র, নথি, ফাইল ও ডাকসামগ্রী সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে পৌঁছে দেওয়া।
- কর্মকর্তার প্রয়োজনে বাইরের কাজে সহায়তা করা (যেমন — ব্যাংক, দপ্তর বা অন্যত্র যাওয়া)।
৩. অফিস রক্ষণাবেক্ষণ কাজ
- অফিস খোলার আগে এবং বন্ধের পরে কক্ষ প্রস্তুত করা বা গুছিয়ে রাখা।
- অফিসের পতাকা উত্তোলন ও নামানো (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে)।
- অফিসের বিভিন্ন সরঞ্জাম সংগ্রহ করতে সহায়তা করা।
৪. যোগাযোগ ও বার্তাবাহী কাজ
- অফিসের ভেতরে ও বাইরে বার্তা পৌঁছে দেওয়া।
- দাপ্তরিক চিঠি, নথি ও কাগজপত্র সঠিক সময়ে সঠিক ব্যক্তির কাছে পৌঁছে দেওয়া।
- সরকারি ডাক ও রেজিস্ট্রি সামগ্রী সংগ্রহ ও বিতরণ করা।
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য: অফিস সহায়ককে কেবল অফিস-সংক্রান্ত কাজই করতে হবে। ঝাড়ুদারের কাজ বা ম্যাথরের (পরিষ্কারক) কাজ করতে অফিস সহায়ককে বাধ্য করা যাবে না।
এম এল এস এস পদের মূল তথ্য এক নজরে
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| পদের আনুষ্ঠানিক নাম | অফিস সহায়ক (Office Sahayak) |
| পদের পুরনো নাম | এমএলএসএস, পিয়ন, চাপরাশি, দফতরি |
| MLSS পূর্ণ রূপ | Member of Lower Subordinate Staff |
| চাকরির শ্রেণি | চতুর্থ শ্রেণি |
| বেতন গ্রেড | ২০তম গ্রেড |
| মূল বেতন (জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫) | ৮,২৫০ – ২০,০১০ টাকা |
| ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা | এসএসসি বা সমমান |
| কর্মঘণ্টা | ৮ ঘণ্টা (সরকারি অফিস সময়) |
| নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ | সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়/দপ্তর/অধিদপ্তর |
| পদোন্নতি | অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক পদে |
এম এল এস এস পদের বেতন কত?
এম এল এস এস বা অফিস সহায়ক পদটি ২০তম গ্রেডের চাকরি। জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫ অনুযায়ী:
- মূল বেতন: ৮,২৫০ টাকা (শুরু) থেকে ২০,০১০ টাকা (সর্বোচ্চ)
- মাসিক সাকুল্য বেতন: গড়ে ১৪,০০০ – ১৫,০০০ টাকার মতো (মূল বেতন + বাড়ি ভাড়া + চিকিৎসা ভাতাসহ)
- এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে সরকারি অংশ + প্রতিষ্ঠান অংশ মিলে বেতন কিছুটা ভিন্ন হতে পারে।
এছাড়া পেনশন, ঈদ বোনাস, অধিকাল ভাতা (অতিরিক্ত কাজের ক্ষেত্রে) পাওয়ার সুবিধাও রয়েছে।
দ্রষ্টব্য: ২০২৬ সালের জুলাই থেকে নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা কার্যকর হলে সমস্ত গ্রেডের বেতন বাড়বে।
এম এল এস এস / অফিস সহায়ক পদে নিয়োগের যোগ্যতা
শিক্ষাগত যোগ্যতা
- যেকোনো স্বীকৃত বোর্ড থেকে মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (SSC) বা সমমানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে।
বয়সসীমা
- সাধারণত ১৮ থেকে ৩০ বছর (সরকারি নিয়ম অনুযায়ী কোটাধারীদের জন্য শিথিলযোগ্য)।
শারীরিক যোগ্যতা
- সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হতে হবে।
পরীক্ষার ধরন
- লিখিত পরীক্ষায় সাধারণত অষ্টম থেকে দশম শ্রেণির বাংলা, ইংরেজি, গণিত এবং সাধারণ জ্ঞান (বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক) থেকে প্রশ্ন করা হয়।
- পরীক্ষার মান সাধারণত কঠিন হয় না। তবে প্রতিযোগিতা অনেক বেশি।
এম এল এস এস পদ থেকে পদোন্নতির সুযোগ আছে কি?
হ্যাঁ, অবশ্যই আছে! এম এল এস এস বা অফিস সহায়ক পদে কর্মরত কর্মচারীরা নির্দিষ্ট যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে পদোন্নতি পেতে পারেন।
পদোন্নতির ধাপ
ধাপ ১: অফিস সহায়ক (গ্রেড-২০) → প্রাথমিক পদ
ধাপ ২: ৫-৭ বছর সন্তোষজনক চাকরি + প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা অর্জন
ধাপ ৩: বিভাগীয় পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া
ধাপ ৪: অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক পদে পদোন্নতি (গ্রেড-১৬)
পদোন্নতির জন্য যা লাগে
- কমপক্ষে ৫ বছরের চাকরির অভিজ্ঞতা।
- এইচএসসি বা সমমান শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকলে ভালো (কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে স্নাতক চাওয়া হয়)।
- কম্পিউটার টাইপিং দক্ষতা (বাংলা ও ইংরেজি) — এটি প্রায় বাধ্যতামূলক।
- কর্মক্ষেত্রে ভালো রেকর্ড ও কর্মদক্ষতা।
টিপস: যদি পদোন্নতি পেতে চান, এখনই কম্পিউটার টাইপিং ও বেসিক অফিস সফটওয়্যার শেখা শুরু করুন। এটি পদোন্নতির পথকে অনেক সহজ করে দেবে।
এম এল এস এস পদে চাকরির সুবিধা-অসুবিধা
সুবিধাসমূহ
- সরকারি চাকরির নিরাপত্তা ও স্থায়িত্ব।
- পেনশন ও অবসর সুবিধা।
- ঈদ বোনাস ও উৎসব ভাতা।
- চিকিৎসা ও বাড়ি ভাড়া ভাতা।
- পদোন্নতির সুযোগ।
- সরকারি ছুটি ও নৈমিত্তিক ছুটির সুবিধা।
- কোনো কোনো দপ্তরে সরকারি আবাসন (কোয়ার্টার) পাওয়ার সুযোগ।
চ্যালেঞ্জসমূহ
- শুরুতে বেতন তুলনামূলক কম।
- কখনো কখনো অফিসের বাইরের অনানুষ্ঠানিক কাজ করতে বলা হয়।
- উচ্চতর পদোন্নতির সুযোগ সীমিত।
সরকারি পিয়নের দায়িত্ব সংক্রান্ত পরিপত্র কী বলে?
সরকারি চাকরি ও সাধারণ প্রশাসন বিভাগের নিয়ন্ত্রণ শাখা থেকে ২৯ অক্টোবর ১৯৬৯ তারিখে (স্মারক নং সংখ্যা ১) জারি করা পরিপত্রে সরকারি পিয়নদের (বর্তমান অফিস সহায়ক) দায়িত্ব ও কর্তব্য নির্ধারণ করা হয়েছে:
১. অফিসের আসবাবপত্র ও রেকর্ড সুন্দরভাবে বিন্যাস ও পরিষ্কার রাখা। ২. অফিসের ফাইল ও কাগজপত্র নির্দেশক্রমে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে বা অন্য অফিসে পাঠানো। ৩. হালকা আসবাবপত্র অফিসের মধ্যে প্রয়োজন অনুযায়ী স্থানান্তর করা। ৪. অফিস চালু থাকাকালীন সার্বক্ষণিক উপস্থিত ও প্রস্তুত থাকা। ৫. কর্মকর্তার নির্দেশিত যেকোনো দাপ্তরিক কাজ সম্পন্ন করা।
এই পরিপত্রের মূল বার্তা হলো — অফিস কর্তৃপক্ষ অফিসের প্রয়োজনে যেকোনো দাপ্তরিক কাজ করাতে পারবেন, তবে ঝাড়ুদার বা পরিচ্ছন্নতাকর্মীর কাজ করাতে পারবেন না।
কোন কোন সরকারি প্রতিষ্ঠানে এম এল এস এস পদে নিয়োগ হয়?
বাংলাদেশের প্রায় সব ধরনের সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে এই পদে নিয়োগ দেওয়া হয়:
- সকল সরকারি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ
- জেলা প্রশাসনের অধীনে বিভিন্ন দপ্তর
- সরকারি স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়
- এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান
- বাংলাদেশ ডাক বিভাগ
- পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর
- স্বাস্থ্য অধিদপ্তর
- কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর
- বিভিন্ন সরকারি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান
এম এল এস এস পরীক্ষার প্রস্তুতি কীভাবে নেবেন?
ধাপে ধাপে প্রস্তুতি
ধাপ ১: বিষয়ভিত্তিক পড়াশোনা
- বাংলা: ব্যাকরণ (সন্ধি, সমাস, বাগধারা), বাংলাদেশের সাহিত্য।
- ইংরেজি: Grammar (Tense, Parts of Speech, Preposition), Simple vocabulary।
- গণিত: ভগ্নাংশ, শতকরা, সরল সমীকরণ, ক্ষেত্রফল।
- সাধারণ জ্ঞান: বাংলাদেশের ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ, ভূগোল, সাম্প্রতিক ঘটনাবলী।
ধাপ ২: বিগত বছরের প্রশ্ন সমাধান
বিগত বছরের প্রশ্নপত্র সমাধান করলে পরীক্ষার ধরন সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়।
ধাপ ৩: নিয়মিত অনুশীলন
প্রতিদিন অন্তত ১-২ ঘণ্টা পড়াশোনা করুন এবং মক টেস্ট দিন।
ধাপ ৪: শারীরিক প্রস্তুতি
মৌখিক পরীক্ষার জন্য আত্মবিশ্বাস বাড়ান এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নভাবে উপস্থিত হন।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
এম এল এস এস এর পূর্ণ রূপ কী?
MLSS-এর পূর্ণ রূপ হলো Member of Lower Subordinate Staff। বাংলায় এর অর্থ নিম্ন অধস্তন কর্মচারী সদস্য।
এমএলএসএস এখন কোন নামে পরিচিত?
২০১৪ সালে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের পরিপত্রের পর এমএলএসএস পদের নতুন আনুষ্ঠানিক নাম হয়েছে “অফিস সহায়ক”।
এম এল এস এস পদের বেতন কত?
জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫ অনুযায়ী অফিস সহায়ক (এমএলএসএস) পদের মূল বেতন ৮,২৫০ থেকে ২০,০১০ টাকা (গ্রেড-২০)। সব ভাতাসহ মাসিক সাকুল্য বেতন ১৪,০০০ – ১৫,০০০ টাকার মতো।
অফিস সহায়ক কততম গ্রেডের চাকরি?
অফিস সহায়ক বা এমএলএসএস পদটি ২০তম গ্রেড এবং চতুর্থ শ্রেণির সরকারি চাকরি।
এমএলএসএস পদে নিয়োগের জন্য কী কী লাগে?
এসএসসি বা সমমান পাস, সুস্বাস্থ্য এবং নির্ধারিত বয়সসীমা (সাধারণত ১৮-৩০ বছর) পূরণ করতে হবে।
অফিস সহায়ক থেকে কি পদোন্নতি হয়?
হ্যাঁ, ৫-৭ বছর কাজ করার পর, প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা ও কম্পিউটার দক্ষতা থাকলে অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক পদে পদোন্নতি পাওয়া সম্ভব।
এমএলএসএস পদে কর্মঘণ্টা কত?
নির্ধারিত কর্মঘণ্টা ৮ ঘণ্টা। অতিরিক্ত কাজ করালে অধিকাল ভাতা পাওয়ার অধিকার আছে।
পিয়ন ও এমএলএসএস কি একই পদ?
হ্যাঁ, পিয়ন ও এমএলএসএস মূলত একই ধরনের পদ ছিল। ২০১৪ সালের পরিপত্রে উভয়কেই “অফিস সহায়ক” নামে একত্রিত করা হয়েছে।
উপসংহার
এম এল এস এস বা অফিস সহায়ক পদটি বাংলাদেশ সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ চাকরির পদ। মাঠ পর্যায় থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় মন্ত্রণালয় পর্যন্ত প্রতিটি সরকারি অফিসে এই পদের কর্মীরা দৈনন্দিন কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত করতে অপরিহার্য ভূমিকা পালন করেন।
কোনো কাজই ছোট নয়। সততা, নিষ্ঠা এবং দক্ষতার সাথে এই পদে কাজ করলে পদোন্নতির মাধ্যমে ক্যারিয়ার এগিয়ে নেওয়া সম্ভব। আর যারা এই পদে আবেদন করতে চান, তারা নিয়মিত সরকারি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির দিকে নজর রাখুন।
তথ্যসূত্র:
- জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের পরিপত্র, ৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৪
- সরকারি চাকুরী ও সাধারণ প্রশাসন বিভাগের স্মারক, ২৯ অক্টোবর ১৯৬৯
- জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫ (গ্রেড-২০)
- bdservicerules.com