বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
সম্মানিত সভাপতি, শ্রদ্ধেয় প্রধান শিক্ষক/অধ্যক্ষ মহোদয়, আমাদের প্রিয় শিক্ষকমণ্ডলী, বর্তমান শিক্ষার্থীবৃন্দ এবং আজকের এই পুনর্মিলনীতে দেশের নানা প্রান্ত থেকে ছুটে আসা প্রিয় প্রাক্তন সহপাঠী ও বন্ধুগণ
আজকের এই মঞ্চে দাঁড়িয়ে কথা বলতে গিয়ে গলা যেন আটকে আসছে। চারদিকে এতগুলো পরিচিত মুখ কেউ একটু বড় হয়েছেন, কারো চুলে রুপালি ছোঁয়া লেগেছে, কারো কপালে সময়ের ছাপ পড়েছে তবুও চোখের দিকে তাকালে সেই চেনা মানুষটিকেই খুঁজে পাচ্ছি।
ফিরে আসার আনন্দ
কত বছর পর আজ আমরা আবার এই চেনা আঙিনায় ফিরে এসেছি! জীবনের ব্যস্ততায়, সংসারের দায়িত্বে, কর্মজীবনের চাপে হয়তো একে অপরের খোঁজ নেওয়া হয়নি নিয়মিত। কিন্তু আজ এই মুহূর্তে সব দূরত্ব যেন মুছে গেছে। মনে হচ্ছে আমরা আবার সেই পুরনো দিনে ফিরে গেছি।
এই বিদ্যালয়ের/কলেজের গেট দিয়ে ঢোকার সময় বুকটা কেমন যেন ভার হয়ে গেল। মনে পড়ে গেল সেই দিনগুলোর কথা যখন এই পথ দিয়ে প্রতিদিন আসতাম, এই মাটিতে দৌড়াতাম, এই গাছের ছায়ায় বসে বন্ধুদের সাথে গল্প করতাম।
স্মৃতির সোনালি পাতা
আমাদের ছাত্রজীবনের প্রতিটি দিন ছিল এক একটি অনন্য অভিজ্ঞতা। পরীক্ষার আগের রাতে বন্ধুর বাসায় গিয়ে পড়া, ক্লাস পালিয়ে মাঠে বসে থাকা, শিক্ষকের চোখ ফাঁকি দিয়ে চিরকুট পাঠানো এই দুষ্টুমিগুলো মনে হলে এখনো মুখে হাসি ফোটে।
বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার উত্তেজনা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মঞ্চে উঠার আনন্দ, প্রথম হওয়ার গর্ব, পরীক্ষায় খারাপ করে মন খারাপ করে বাড়ি ফেরা এই সব অনুভূতি মিলিয়েই তৈরি হয়েছে আমাদের ছাত্রজীবনের অপূর্ব স্মৃতিভান্ডার।
আর সেই টিফিনের ঘণ্টা পড়ার সাথে সাথে ছুটে যাওয়া ক্যান্টিনে সেই স্মৃতি আজও কি মনে পড়ছে? আমি জানি, এই মুহূর্তে আপনাদের সবার মনেই একই ছবি ভাসছে।
শিক্ষকদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা
আমাদের শ্রদ্ধেয় শিক্ষকমণ্ডলী আপনাদের কথা বলতে গেলে ভাষা ছোট হয়ে যায়। আমরা যখন দুরন্ত, অবুঝ, জীবনের পথ চেনা নেই তখন আপনারা আলোর দিশারী হয়ে আমাদের পথ দেখিয়েছেন।
আপনাদের কারো কারো কঠিন শাসনকে তখন হয়তো কঠোর মনে হয়েছিল। কিন্তু আজ বুঝতে পারি সেই শাসনের আড়ালে কতটা গভীর ভালোবাসা ছিল। আপনারা শুধু পাঠ্যবই পড়াননি জীবনের পাঠ দিয়েছেন, মানুষ হওয়ার শিক্ষা দিয়েছেন।
আজ আমরা যে যেখানেই আছি, যতটুকু প্রতিষ্ঠিত হয়েছি তার পেছনে আপনাদের অবদান অনস্বীকার্য। আপনাদের প্রতি আমাদের এই ঋণ কোনোদিন শোধ হওয়ার নয়। শুধু এটুকু বলতে চাই আপনাদের প্রতিটি কথা আমাদের হৃদয়ে গেঁথে আছে।
বর্তমান শিক্ষার্থীদের প্রতি
প্রিয় বর্তমান শিক্ষার্থীরা, তোমাদের দিকে তাকিয়ে নিজেদের পুরনো দিন মনে পড়ে যাচ্ছে। তোমরা এখন যে সময়টা পার করছ এটি জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সময়। এই মুহূর্তগুলো ধরে রাখো।
শুধু ফলাফলের পেছনে ছুটো না জ্ঞান অর্জন করো, বন্ধুত্ব গড়ো, স্বপ্ন দেখো। আর এই প্রতিষ্ঠানের মাটি, এই শিক্ষকদের স্নেহ এগুলোর মূল্য বুঝতে পারো এখনই। আমাদের মতো বিদায়ের পরে অনুশোচনা করতে হবে না।
প্রতিষ্ঠানের প্রতি দায়বদ্ধতা
আজ আমরা পুনর্মিলিত হয়েছি এটি শুধু আনন্দের উপলক্ষ নয়, এটি একটি দায়িত্বের ডাকও। এই প্রতিষ্ঠান আমাদের গড়েছে এখন সময় এসেছে আমরা এই প্রতিষ্ঠানের জন্য কিছু করার।
আমরা যে যেখানে আছি, যার যতটুকু সাধ্য আছে সেই সামর্থ্য নিয়ে এই প্রতিষ্ঠানের পাশে দাঁড়াই। আগামী প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা যেন আরও ভালো পরিবেশে পড়াশোনার সুযোগ পায়, সেটা নিশ্চিত করাও আমাদের দায়িত্ব।
বন্ধুত্বের বন্ধন
প্রিয় বন্ধুরা, জীবনের পথে চলতে গিয়ে হয়তো অনেকের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। আজকের এই দিনটি হোক সেই বিচ্ছিন্নতা ঘোচানোর দিন। পুরনো ভুল বোঝাবুঝি থাকলে মিটিয়ে ফেলি, পুরনো অভিমান থাকলে ভুলে যাই।
কারণ এই বন্ধুরাই আমাদের জীবনের সবচেয়ে নিখাঁদ সম্পদ। বয়স বাড়লে বোঝা যায় সত্যিকারের বন্ধু পাওয়া কত কঠিন। আর আমাদের সেই বন্ধুরা আজ সামনেই বসে আছে।
শেষকথা
আজকের এই পুনর্মিলনী আয়োজন করতে যারা অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন, তাদের প্রতি আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই। এই আয়োজন শুধু একটি অনুষ্ঠান নয় এটি আমাদের শিকড়ের সাথে পুনরায় সংযুক্ত হওয়ার একটি সুযোগ।
আমরা কোথায় যাই, কতদূর যাই এই বিদ্যালয়ের/কলেজের নাম আমাদের পরিচয়ের একটি অংশ হয়ে থাকবে চিরকাল। এই মাটি আমাদের, এই আকাশ আমাদের, এই স্মৃতি আমাদের।
আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের সকলকে সুস্থ রাখুন, সফল রাখুন এবং বারবার এইভাবে একত্রিত হওয়ার সুযোগ দিন।
আবার দেখা হবে। ভালো থাকবেন সবাই। আল্লাহ হাফেজ।