অফিস সহায়ক এর কাজ কি? সরকারি দপ্তরে দায়িত্ব ও বেতন

আপনি কি সরকারি চাকরিতে অফিস সহায়ক পদে যোগ দিতে যাচ্ছেন, নাকি এই পদের কাজ ও দায়িত্ব সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চাইছেন? সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অথচ সাধারণ পদ হলো অফিস সহায়ক (সাবেক এমএলএসএস)।

যদি আপনার প্রশ্ন হয় অফিস সহায়ক এর কাজ কি, তবে সহজ উত্তর হলো: অফিসের ফাইলপত্র সংরক্ষণ, নথিপত্র এক টেবিল থেকে অন্য টেবিলে নেওয়া, এবং কর্মকর্তাদের দাপ্তরিক কাজে লজিস্টিক সহায়তা দেওয়াই হলো এর মূল কাজ। নিচে বিভিন্ন দপ্তরে (স্কুল, ডিসি অফিস, মন্ত্রণালয়) এদের কাজের বিবরণ বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

অফিস সহায়ক এর কাজ কি কি?

অফিস সহায়ক (Office Support Staff) হলেন সরকারি ২০তম গ্রেডের একজন কর্মচারী। প্রতিষ্ঠানের ধরন অনুযায়ী তাদের কাজ ভিন্ন হতে পারে, তবে মৌলিক দায়িত্বগুলো হলো:

  • ফাইল মুভমেন্ট: অফিসের ফাইল ও নথিপত্র এক কক্ষ থেকে অন্য কক্ষে বা বসের টেবিলে পৌঁছে দেওয়া।
  • বার্তা বাহক (Despatch): অফিসের চিঠি, নোটিশ বা সার্কুলার অন্য দপ্তরে বা শাখায় পৌঁছে দেওয়া।
  • আপ্যায়ন ও পরিচ্ছন্নতা: মিটিং চলাকালীন বা সাধারণ সময়ে কর্মকর্তাদের চা-পানি পরিবেশন এবং নিজের দায়িত্বপ্রাপ্ত ডেস্ক বা আলমারি গুছিয়ে রাখা।
  • ফটোকপি ও জিপিং: প্রয়োজলে নথিপত্র ফটোকপি করা, বাইন্ডিং করা এবং ফাইল ট্যাগ লাগানো।
  • অতিথি সেবা: অফিসে আগত দর্শনার্থী বা সেবাগ্রহীতাদের সঠিক ডেস্কে দেখিয়ে দেওয়া।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অফিস সহায়কের কাজ

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কাজের পরিবেশ সাধারণ অফিস থেকে কিছুটা ভিন্ন। এখানে স্কুলের অফিস সহায়ক এর কাজ কি, মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অফিস সহায়ক এর কাজ কি বা হাই স্কুলের অফিস সহায়ক এর কাজ কি সবগুলো প্রশ্নের উত্তর মূলত একই সূত্রে গাঁথা।

১. ঘণ্টা ও সময় ব্যবস্থাপনা: সঠিক সময়ে ক্লাসের ঘণ্টা বাজানো এবং টিফিন বা ছুটির সংকেত দেওয়া।

২. প্রধান শিক্ষকের সহায়তা: হেডমাস্টারের রুমে ফাইল আনা-নেওয়া, স্বাক্ষর নেওয়া এবং শিক্ষকদের নোটিশ খাতা (Notice Book) ক্লাসে ক্লাসে পৌঁছে দেওয়া।

৩. পরীক্ষা পরিচালনা: পরীক্ষার সময় প্রশ্নপত্র ও খাতা বহনে শিক্ষকদের সহায়তা করা এবং সিট প্ল্যানিংয়ে সাহায্য করা।

৪. গেটের দায়িত্ব: স্কুল বা কলেজ খোলার সময় ক্লাসরুমের তালা খোলা এবং ছুটির পর সব চেক করে বন্ধ করা।

জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে অফিস সহায়ক এর কাজ কি

জেলা প্রশাসকের কার্যালয় (DC Office) হলো জেলার প্রাণকেন্দ্র। এখানে কাজের চাপ ও প্রটোকল অনেক কড়া।

  • প্রটোকল ডিউটি: ডিসি বা এডিসি স্যারদের সাথে মিটিং, মোবাইল কোর্ট বা ভিজিটে যাওয়া।
  • জরুরি ফাইল মুভমেন্ট: ডিসি অফিসের বিভিন্ন শাখা (যেমন: ভূমি অধিগ্রহণ, সাধারণ শাখা, জুডিশিয়াল মুন্সিখানা) এর মধ্যে ফাইল দ্রুত চালাচালি করা।
  • জনসংযোগ: ডিসি অফিসে প্রচুর সাধারণ মানুষ আসেন। তাদের সিরিয়াল মেইনটেইন করা এবং সাক্ষাৎপ্রার্থীদের স্লিপ স্যারের কাছে পৌঁছে দেওয়া।
  • রেকর্ড রুম: মহাফেজখানা বা রেকর্ড রুম থেকে পুরনো নথিপত্র খুঁজে বের করতে রেকর্ড কিপারকে সাহায্য করা।

বিশেষায়িত দপ্তর ও মন্ত্রণালয়ে কাজের ধরন

বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরে কাজের ধরনে কিছুটা ভিন্নতা থাকে। নিচে ছক আকারে বিভিন্ন দপ্তরের স্পেসিফিক কাজগুলো তুলে ধরা হলো:

দপ্তরের নামঅফিস সহায়কের বিশেষ কাজ
তথ্য অধিদপ্তরপ্রেস রিলিজ বা সংবাদ বিজ্ঞপ্তি সর্টিং করা, মিডিয়া মনিটরিং সেলে পেপার কাটিং ফাইলে যুক্ত করা।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়অত্যন্ত গোপনীয়তা রক্ষা করা। সিকিউরিটি পাস ছাড়া কাউকে প্রবেশ করতে না দেওয়া এবং সেনসিটিভ ফাইল সাবধানে রাখা।
কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরপলিটেকনিক বা ভোকেশনাল বোর্ডের সনদপত্র ও রেজিস্ট্রেশন সংক্রান্ত ফাইল মুভমেন্ট করা।
উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোবিভিন্ন এনজিও ও প্রজেক্টের ফাইল দেখাশোনা এবং ট্রেনিং ভেন্যুতে লজিস্টিক সাপোর্ট দেওয়া।
বিমান বাহিনী (বেসামরিক)এয়ার বেস বা ইউনিটে দাপ্তরিক কাজে অফিসারদের সহায়তা করা এবং কড়া ডিসিপ্লিন মেনে চলা।
কাস্টমস ও ভ্যাটপোর্টে বা এয়ারপোর্টে শুল্কায়ন ফাইলের কাজ করা। অনেক সময় সিজার লিস্ট তৈরিতে সাহায্য করতে হয়।
NSI (এনএসআই)ফিল্ড অফিসের দাপ্তরিক রেকর্ড রাখা এবং অত্যন্ত সতর্কতার সাথে গোপনীয় নথি হ্যান্ডেল করা।

অফিস সহায়ক এর কাজ কি বেতন কত?

এটি চাকরিপ্রার্থীদের সবচেয়ে সাধারণ প্রশ্ন অফিস সহায়ক এর কাজ কি বেতন কত? বাংলাদেশে সরকারি চাকরিতে বেতন নির্ধারিত হয় “জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫” অনুযায়ী।

  • গ্রেড: ২০তম গ্রেড।
  • মূল বেতন (Basic): ৮,২৫০ টাকা – ২০,০১০ টাকা।
  • বাড়তি সুবিধা: মূল বেতনের সাথে বাড়ি ভাড়া (৪৫%-৬৫%), চিকিৎসা ভাতা (১৫০০ টাকা), যাতায়াত ভাতা, টিফিন ভাতা এবং উৎসব ভাতা যুক্ত হয়।
  • মোট বেতন: চাকরিতে যোগদানের শুরুতে সব মিলিয়ে সাকুল্যে প্রায় ১৪,০০০ থেকে ১৬,০০০ টাকা (আনুমানিক) পাওয়া যায়।

অফিস সহায়ক কি পদোন্নতি পায়?

অনেকেই ভাবেন এই পদে হয়তো কোনো ভবিষ্যৎ নেই। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সরকারি অফিস সহায়ক পদে পদোন্নতির সুযোগ রয়েছে।

  • টানা ৫-৭ বছর সন্তোষজনক চাকরি এবং বিভাগীয় পরীক্ষায় (Departmental Exam) পাস করলে অফিস সহকারী (Office Assistant cum Computer Operator) বা ডেসপাচ রাইডার পদে প্রমোশন পাওয়া যায়।
  • অনেকে পরবর্তীতে পড়াশোনা শেষ করে উচ্চতর পদেও আবেদন করতে পারেন।

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

১. অফিস পিয়নের কাজ কী? অফিস সহায়ক আর পিয়ন কি একই?

হ্যাঁ, আগে যাকে আনুষ্ঠানিকভাবে “পিয়ন” বা “এমএলএসএস” বলা হতো, এখন তাকেই সম্মানজনকভাবে অফিস সহায়ক বলা হয়। কাজের ধরনে কোনো পরিবর্তন আসেনি, শুধু পদের নাম পরিবর্তন হয়েছে।

২. একজন অফিস সহকারীর দায়িত্ব ও কর্তব্য কী কী?

খেয়াল রাখবেন, অফিস সহকারী এবং অফিস সহায়ক এক নয়। অফিস সহকারী (১৬তম গ্রেড) কম্পিউটারে কাজ করেন ও ড্রাফট লেখেন। আর অফিস সহায়ক (২০তম গ্রেড) তাকে ফিজিক্যাল কাজে সাহায্য করেন।

৩. এই চাকরিতে কি কাজের চাপ খুব বেশি?

দপ্তর ভেদে ভিন্ন হয়। স্কুল বা ছোট অফিসে চাপ কম থাকে। কিন্তু ডিসি অফিস, মন্ত্রণালয় বা পুলিশ বিভাগে কাজের চাপ ও সময়সীমা অনেক বেশি থাকে।

শেষকথা

পরিশেষে বলা যায়, অফিস সহায়ক পদটি হয়তো প্রশাসনিক কাঠামোর নিচের দিকের পদ, কিন্তু অফিসের চাকা সচল রাখতে তাদের ভূমিকা ইঞ্জিনের তেলের মতো। আপনি যদি সৎ, পরিশ্রমী এবং সময়ানুবর্তী হন, তবে এই সরকারি চাকরিটি আপনার জন্য একটি নিরাপদ ও সম্মানজনক ক্যারিয়ার হতে পারে।

Leave a Comment