জীবনের আসল উদ্দেশ্য কী?

জীবনের আসল উদ্দেশ্য হলো আল্লাহকে আপন করে নেওয়া এবং তাঁর সন্তুষ্টি অর্জন করা। দুনিয়ার কোনো সম্পর্কই (বাবা-মা, স্বামী-স্ত্রী, সন্তান) স্থায়ী বা ষোলআনা খাঁটি নয়। একমাত্র আল্লাহকে আপন করতে পারলেই ইহকাল ও পরকালে প্রকৃত শান্তি ও মুক্তি পাওয়া সম্ভব।

জীবনের বাস্তবতা ও সম্পর্কের সীমাবদ্ধতা

আমরা জীবনে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বা ধনী হওয়ার মতো অনেক লক্ষ্য নিয়ে ছুটছি। দিনশেষে সবকিছুই ছেড়ে চলে যেতে হবে। তিনি দুনিয়ার সম্পর্কের একটি রূঢ় বাস্তবতা তুলে ধরেন:

  • ক্ষণস্থায়ী সম্পর্ক: মা-বাবা, স্বামী-স্ত্রী বা সন্তান কেউই সারাজীবন ১০০% আপন থাকে না। স্বার্থের দ্বন্দ্বে বা সময়ের ব্যবধানে এই সম্পর্কগুলোতেও ফাটল ধরে।
  • ব্যর্থ প্রচেষ্টা: মানুষকে খুশি করার আজীবন সংগ্রামে আমরা প্রায়ই ব্যর্থ হই। কখনো বাবাকে, কখনো বন্ধুকে, আবার কখনো জীবনসঙ্গীকে খুশি করতে গিয়ে আমরা হাপিয়ে উঠি, কিন্তু কাউকে ষোলআনা সন্তুষ্ট করা সম্ভব হয় না।
  • প্রকৃত বন্ধু: একমাত্র আল্লাহই এমন সত্তা, যাঁকে আপন করলে তিনি কখনো পর হন না। সুখে-দুঃখে, গোপনে-প্রকাশ্যে একমাত্র তাঁর কাছেই মনের সব কথা খুলে বলা যায় এবং শান্তি পাওয়া যায়।

আল্লাহর ওলি (বন্ধু) হওয়ার সহজ উপায়

আমাদের সমাজে অনেকেই মনে করেন, আল্লাহর ওলি হতে হলে বিশেষ লেবাস, লম্বা দাড়ি, বা অলৌকিক ক্ষমতা (যেমন: ফুঁ দিয়ে রোগ ভালো করা, মনের কথা বলে দেওয়া) থাকতে হবে। কিন্তু এসব আল্লাহর ওলির পরিচয় নয়।

প্রকৃত ওলির পরিচয়:

কুরআনের আলোকে আল্লাহর ওলি হওয়ার দুটি প্রধান শর্ত হলো:

১. ঈমান (বিশ্বাস): আল্লাহর প্রতি অটুট বিশ্বাস।

২. তাকওয়া (খোদাভীতি): আল্লাহ যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বেঁচে থাকা এবং যা আদেশ করেছেন তা পালন করা।

“আল্লাহর ওলিদের কোনো ভয় নেই এবং তারা চিন্তিতও হবে না।” (আল-কুরআন)

কুরআন বুঝে পড়ার গুরুত্ব (The Importance of Understanding Quran)

আমরা অনেকেই “শুনে মুসলমান”, “পড়ে মুসলমান” নই।

  • বুঝে পড়ার প্রয়োজনীয়তা: আল্লাহ কুরআনের প্রথম নির্দেশ দিয়েছেন “পড়ো” (ইকরা)। না বুঝে শুধু তেলাওয়াত করা যথেষ্ট নয়। তিনি বলেন, “বুঝে তেলাওয়াত করাই হলো হক তেলাওয়াত।”
  • হুজুরদের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা: সাধারণ মানুষ নিজে কুরআন না পড়ে শুধু হুজুরদের কথার ওপর নির্ভর করে। ফলে অনেক সময় তারা বিভ্রান্ত হয় বা শিরক-বিদআতে লিপ্ত হয়।
  • সমাধান: প্রতিদিন অন্তত ১০-১৫ মিনিট সময় নিয়ে কুরআনের অনুবাদ ও তাফসীর (যেমন: মাআরিফুল কুরআন বা তাফসীরে তাওযীহুল কুরআন) পড়ার পরামর্শ দেন তিনি।

নামাজ ও দোয়ার শক্তি

বিপদ-আপদে আমরা পীর-ফকির বা মাজারের দিকে ছুটি, যা ঈমান নষ্টের কারণ হতে পারে। এর পরিবর্তে একটি শক্তিশালী আমল নামাজ ও সেজদা

  • আল্লাহর সবচেয়ে কাছে: বান্দা যখন সেজদায় যায়, তখন সে আল্লাহর সবচেয়ে নিকটে থাকে।
  • বিপদ মুক্তির আমল: তাহাজ্জুদ বা ফরজ নামাজের সেজদায় নিজের ভাষায় আল্লাহর কাছে মনের আকুতি জানানোই হলো বিপদ থেকে মুক্তির শ্রেষ্ঠ উপায়। তিনি একটি সত্য ঘটনা উল্লেখ করেন যেখানে এক ব্যক্তি তাহাজ্জুদের সেজদায় দোয়া করে জমি সংক্রান্ত জটিল আইনি ঝামেলা থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন।

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)

১. আল্লাহর ওলি হতে হলে কি পীর ধরতে হবে?

না। কুরআন ও সহীহ সুন্নাহ অনুযায়ী জীবন যাপন করলে যে কেউ আল্লাহর ওলি হতে পারেন। এর জন্য বিশেষ কোনো পীরের মুরিদ হওয়ার শর্ত নেই।

২. কুরআন কি নিজে নিজে পড়া যাবে, নাকি ওস্তাদ লাগবে?

প্রাথমিকভাবে কুরআনের অনুবাদ ও নির্ভরযোগ্য তাফসীর নিজে পড়া উচিত। তবে মাসআলা-মাসাইল (ইসলামী আইন) বোঝার জন্য অবশ্যই হক্কানি আলেম বা মুফতিদের শরণাপন্ন হতে হবে। নিজে পড়ে ফতোয়া দেওয়া যাবে না।

৩. বেনামাজি কি জান্নাতে যাবে?

আলোচক স্পষ্ট করেছেন যে, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাদিস অনুযায়ী নামাজ না পড়লে ঈমান ঠিক থাকে না। নামাজই হলো মুমিনের প্রধান পরিচয়।

৪. বিপদ হলে কী করা উচিত?

বিপদে পড়লে কোনো মাজারে বা পীরের কাছে না গিয়ে, ওজু করে নামাজে দাঁড়িয়ে সেজদায় আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া উচিত।

পরিশেষে

জীবনের উদ্দেশ্য কেবল দুনিয়াবি সফলতা নয়, বরং মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। ডা. খন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীরের এই আলোচনা আমাদের শেখায় যে, গতানুগতিক ধর্মান্ধতা পরিহার করে কুরআন-সুন্নাহর জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমেই আমরা প্রকৃত মুমিন হতে পারি। আসুন, আমরা প্রতিদিন অন্তত কিছু সময় কুরআন বুঝে পড়ার চেষ্টা করি এবং আল্লাহকে আমাদের জীবনের একমাত্র অবিচ্ছেদ্য বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করি।

দ্রষ্টব্য: এই আর্টিকেলটি ডা. খন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীরের ভিডিও লেকচারের ওপর ভিত্তি করে শিক্ষামূলক উদ্দেশ্যে তৈরি। বিস্তারিত জানতে মূল ভিডিওটি দেখার অনুরোধ রইল।

Leave a Comment