মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রধানত তিনটি কারণে গ্রিনল্যান্ড দখল বা ক্রয় করতে আগ্রহী: প্রথমত, আর্কটিক অঞ্চলে রাশিয়া ও চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিক প্রভাব কমানো; দ্বিতীয়ত, গ্রিনল্যান্ডের বরফের নিচে থাকা বিশাল বিরল খনিজ সম্পদের (Rare Earth Minerals) নিয়ন্ত্রণ নেওয়া; এবং তৃতীয়ত, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তৈরি হওয়া নতুন এবং সংক্ষিপ্ত আন্তর্জাতিক শিপিং রুটগুলোর ওপর আধিপত্য বিস্তার করা।
গ্রিনল্যান্ড কেন হঠাৎ আলোচনায়?
২০১৯ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন প্রথমবার গ্রিনল্যান্ড কেনার প্রস্তাব দিয়েছিলেন, তখন অনেকে একে ‘রসিকতা’ হিসেবে দেখেছিলেন। কিন্তু ২০২৫ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর তিনি এই বিষয়ে অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। বিশেষ করে সাম্প্রতিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং খনিজ সম্পদের বিশ্বব্যাপী চাহিদার কারণে এই বরফে ঢাকা দ্বীপটি এখন বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী দেশগুলোর কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
গ্রিনল্যান্ড সম্পর্কে কিছু মৌলিক তথ্য
- আয়তন: পৃথিবীর বৃহত্তম দ্বীপ (প্রায় ২১.৬ লাখ বর্গকিলোমিটার)।
- জনসংখ্যা: মাত্র ৫৬,০০০ এর কাছাকাছি।
- রাজনৈতিক অবস্থান: এটি ডেনমার্কের একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল।
- ভৌগোলিক অবস্থান: উত্তর আটলান্টিক ও আর্কটিক মহাসাগরের মাঝে অবস্থিত।
কেন ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ডের পেছনে মরিয়া?
ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড দখলের উচ্চাকাঙ্ক্ষার পেছনে মূলত তিনটি কৌশলগত ও অর্থনৈতিক কারণ কাজ করছে:
১. সামরিক ও ভূ-রাজনৈতিক নিরাপত্তা (The GIUK Gap)
যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য গ্রিনল্যান্ড একটি ‘প্রতিরক্ষা প্রাচীর’ হিসেবে কাজ করে।
- রাশিয়াকে প্রতিরোধ: রাশিয়ার পারমাণবিক সাবমেরিনগুলো আর্কটিক থেকে আটলান্টিকে প্রবেশ করতে হলে গ্রিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড এবং যুক্তরাজ্যের মধ্যবর্তী সমুদ্রপথ (GIUK Gap) ব্যবহার করতে হয়। গ্রিনল্যান্ড নিয়ন্ত্রণে থাকলে যুক্তরাষ্ট্র সহজেই রাশিয়ার গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে।
- চীনের আধিপত্য রুখে দেওয়া: চীন নিজেকে একটি ‘নিয়ার আর্কটিক স্টেট’ হিসেবে দাবি করে এই অঞ্চলে প্রভাব বাড়াতে চায়। যুক্তরাষ্ট্র কোনোভাবেই উত্তর মেরুর কাছে চীনের উপস্থিতি মেনে নিতে রাজি নয়।
২. বিরল খনিজ সম্পদের ভাণ্ডার
বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্রিনল্যান্ডের উপকূলীয় এলাকায় পৃথিবীর অন্যতম বড় রেয়ার আর্থ মিনারেলস বা বিরল ধাতুর খনি রয়েছে।
- স্মার্টফোন, ইলেকট্রিক গাড়ি (EV) এবং আধুনিক যুদ্ধাস্ত্র তৈরির জন্য এই খনিজগুলো অপরিহার্য।
- বর্তমানে এই বাজারের সিংহভাগ চীনের নিয়ন্ত্রণে। গ্রিনল্যান্ড দখল করতে পারলে যুক্তরাষ্ট্র খনিজ সম্পদের ক্ষেত্রে চীনের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে স্বাবলম্বী হতে পারবে।
৩. নতুন শিপিং রুট ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে উত্তর মেরুর বরফ দ্রুত গলে যাচ্ছে। এর ফলে তৈরি হচ্ছে নতুন সব নৌপথ:
- সময় ও অর্থ সাশ্রয়: এই রুটগুলো সুয়েজ খালের চেয়ে অনেক সংক্ষিপ্ত, যা বিশ্ব বাণিজ্যের পরিবহন খরচ বহুগুণ কমিয়ে দেবে।
- নিয়ন্ত্রণ: যার হাতে গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ থাকবে, সেই মূলত এই নতুন বাণিজ্যিক পথের ‘চৌকিদার’ হিসেবে কাজ করবে।
আমেরিকা কি আগেও কিনতে চেয়েছিল?
হ্যাঁ, গ্রিনল্যান্ড কেনার চেষ্টা এটিই প্রথম নয়।
- ১৮৬৭ সাল: যুক্তরাষ্ট্র প্রথমবার কেনার প্রস্তাব দেয়।
- ১৯৪৬ সাল: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যান ১০ কোটি ডলারের বিনিময়ে দ্বীপটি কিনতে চেয়েছিলেন, কিন্তু ডেনমার্ক তা প্রত্যাখ্যান করে।
- ২০১৯ ও ২০২৫: ট্রাম্প পুনরায় এই বিষয়টি সামনে নিয়ে আসেন এবং বর্তমানে সামরিক শক্তি ব্যবহারেরও প্রচ্ছন্ন হুমকি দিচ্ছেন।
সাধারণ মানুষের জিজ্ঞাসা
১. ডেনমার্ক কি গ্রিনল্যান্ড বিক্রি করবে?
না, ডেনমার্ক এবং গ্রিনল্যান্ড সরকার পরিষ্কারভাবে জানিয়েছে যে, গ্রিনল্যান্ড কোনো বাণিজ্যিক পণ্য নয় এবং এটি বিক্রির জন্য উন্মুক্ত নয়। তবে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কৌশলগত অংশীদারিত্ব বজায় রাখতে আগ্রহী।
২. গ্রিনল্যান্ড কি স্বাধীন হতে পারে?
২০০৮ সালের গণভোট অনুযায়ী গ্রিনল্যান্ডের নিজস্ব সরকার রয়েছে। তারা চাইলে ভবিষ্যতে পূর্ণ স্বাধীনতার পথে হাঁটতে পারে, তবে বর্তমানে অর্থনৈতিকভাবে তারা এখনো ডেনমার্কের বার্ষিক অনুদানের ওপর নির্ভরশীল।
৩. গ্রিনল্যান্ড দখল করলে ন্যাটোর (NATO) কী হবে?
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র যদি জোরপূর্বক গ্রিনল্যান্ড দখল করতে চায়, তবে ডেনমার্কসহ ইউরোপীয় মিত্রদের সাথে সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটবে। এমনকি এটি ন্যাটো জোটের অস্তিত্বকেও সংকটে ফেলতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য এর তাৎপর্য কী?
সরাসরি গ্রিনল্যান্ডের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক না থাকলেও, আর্কটিক অঞ্চলের বরফ গলা এবং এই অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিশ্বশক্তির লড়াই পরোক্ষভাবে বাংলাদেশের মতো জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোকে প্রভাবিত করবে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন শিপিং রুটের প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে আমাদের ওপর পড়বে।
তথ্যসূত্র: আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম (Reuters, BBC), মার্কিন সিনেট কমিটির শুনানি এবং সাম্প্রতিক ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষণ।
I’m Md Parvez Hossen. I’m professional Blogger and SEO expert. I’m Living in USA.