ইস্কান্দার মিসাইল (Iskander Missile) হলো রাশিয়ার তৈরি একটি অত্যাধুনিক এবং অপ্রতিরোধ্য ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা। এটি মূলত ৫০০ কিলোমিটার পাল্লার মধ্যে নিখুঁতভাবে লক্ষ্যভেদে সক্ষম। এর বিশেষত্ব হলো এটি উড্ডয়নকালে মাঝ আকাশে নিজের গতিপথ পরিবর্তন করতে পারে এবং অত্যন্ত নিচু দিয়ে উড়ে গিয়ে শত্রুপক্ষের রাডার ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা (যেমন- আয়রন ডোম বা প্যাট্রিয়ট) ফাঁকি দিতে পারে। সম্প্রতি ইরানের হাতে এই মিসাইল আসার খবর মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক সমীকরণ পুরোপুরি বদলে দিয়েছে।
ইস্কান্দার মিসাইল আসলে কী?
ইস্কান্দার-এম (Iskander-M) হলো রাশিয়ার তৈরি একটি মোবাইল শর্ট-রেঞ্জ ব্যালিস্টিক মিসাইল সিস্টেম। এটি আগের প্রজন্মের মিসাইলগুলোর চেয়ে অনেক বেশি উন্নত এবং ধ্বংসাত্মক। এটি শুধু একটি ক্ষেপণাস্ত্র নয়, বরং একটি সম্পূর্ণ প্রতিরক্ষা ও আক্রমণাত্মক কৌশল।
২০২৬ সালের শুরুর দিকে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে খবর আসে যে, রাশিয়া তাদের দীর্ঘদিনের মিত্র ইরানকে এই বিধ্বংসী অস্ত্র সরবরাহ করেছে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যে ইরান এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে।
ইস্কান্দার মিসাইল কেন এত ভয়ঙ্কর?
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, ইস্কান্দার মিসাইলকে ‘অপ্রতিরোধ্য’ বলার পেছনে ৩টি প্রধান কারণ রয়েছে:
- মাঝ আকাশে দিক পরিবর্তন (Maneuverability): সাধারণ ব্যালিস্টিক মিসাইল একটি নির্দিষ্ট পথে চলে, যা আগে থেকে অনুমান করা সম্ভব। কিন্তু ইস্কান্দার উড্ডয়নের সময় দিক পরিবর্তন করতে পারে, ফলে একে ধ্বংস করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
- রাডার ফাঁকি দেওয়ার ক্ষমতা: এই মিসাইলটি রাডারের সীমার অনেক নিচু দিয়ে উড়ে যায় এবং এতে উন্নত ইলেকট্রনিক কাউন্টার-মেজার রয়েছে, যা শত্রুর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে বিভ্রান্ত করে দেয়।
- অত্যন্ত নিখুঁত লক্ষ্যভেদ: এটি লক্ষ্যবস্তুর মাত্র ৫-৭ মিটারের মধ্যে আঘাত হানতে সক্ষম। এটি বাঙ্কার, সামরিক সদর দপ্তর এবং বিমান ঘাঁটি ধ্বংস করতে বিশেষভাবে ডিজাইন করা হয়েছে।
কেন ইরানকে এই মিসাইল দিল রাশিয়া?
রাশিয়া এবং ইরানের মধ্যকার সামরিক সম্পর্ক বর্তমানে একটি নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। এর পেছনে প্রধানত দুটি কারণ রয়েছে:
- সামরিক ভারসাম্য রক্ষা: ইসরায়েল বা আমেরিকার সম্ভাব্য আক্রমণ থেকে ইরানকে সুরক্ষা দিতে এবং পাল্টা আক্রমণ করার ক্ষমতা বাড়াতে এই মিসাইল সহায়তা করবে।
- কৌশলগত মিত্রতা: ইউক্রেন এবং মধ্যপ্রাচ্য ইস্যুতে রাশিয়া ও ইরান একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। তেহরানকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে মস্কো মূলত এই অঞ্চলে আমেরিকার প্রভাব কমাতে চায়।
মধ্যপ্রাচ্য ও বিশ্ব রাজনীতিতে এর প্রভাব
ইরানের হাতে ইস্কান্দার আসার ফলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে:
- ইসরায়েলের উদ্বেগ: ইসরায়েলের অত্যাধুনিক ‘আয়রন ডোম’ বা ‘অ্যারো’ সিস্টেম এই মিসাইল ঠেকাতে পারবে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে।
- নিরাপদ ইরান: এখন যেকোনো দেশ ইরানের ওপর সামরিক হামলার পরিকল্পনা করার আগে ১০ বার ভাববে, কারণ ইস্কান্দার মুহূর্তের মধ্যে পাল্টা আঘাত হানতে সক্ষম।
- অস্থিরতা: ইউরোপের অনেক দেশও এই ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ে আতঙ্কিত, কারণ এটি তাদের প্রভাববলয়ে থাকা অঞ্চলের ওপর সরাসরি হুমকি তৈরি করে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এর গুরুত্ব কী?
অনেকেই মনে করতে পারেন গ্রিনল্যান্ড বা ইরানের এই অস্থিরতা বাংলাদেশের জন্য জরুরি নয়। কিন্তু বাস্তবে এটি আমাদের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে:
- জ্বালানি তেলের দাম: মধ্যপ্রাচ্যে যেকোনো অস্থিরতা মানেই বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি, যার প্রভাব পড়বে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে।
- প্রবাসী শ্রমিক: আমাদের বিপুল সংখ্যক রেমিট্যান্স যোদ্ধা মধ্যপ্রাচ্যে কাজ করেন। এই অঞ্চলের সামরিক উত্তেজনা তাদের নিরাপত্তা ও আমাদের রেমিট্যান্স প্রবাহে প্রভাব ফেলতে পারে।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
১. ইস্কান্দার মিসাইলের পাল্লা কত?
ইস্কান্দার-এম সংস্করণের পাল্লা প্রায় ৫০০ কিলোমিটার। তবে এটি প্রয়োজনে পারমাণবিক এবং সাধারণ—উভয় ধরনের ওয়ারহেড বহন করতে পারে।
২. এটি কি আয়রন ডোম ফাঁকি দিতে পারে?
হ্যাঁ, ভিডিওর তথ্য অনুযায়ী, ইস্কান্দার এমনভাবে তৈরি যা প্যাট্রিয়ট বা আয়রন ডোমের মতো উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে বিভ্রান্ত করতে পারে এবং সেগুলো ভেদ করে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করতে পারে।
৩. রাশিয়া ছাড়া আর কার কাছে এই মিসাইল আছে?
রাশিয়া ছাড়াও বেলারুশ এবং বর্তমানে ইরানের কাছে এই মিসাইল ব্যবস্থা থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। এছাড়া আলজেরিয়া এবং আর্মেনিয়াও এই সিস্টেমের কিছু সংস্করণ ব্যবহার করে।
শেষকথা
ইস্কান্দার মিসাইল ইরানের হাতে আসা কেবল একটি অস্ত্র কেনা-বেচার বিষয় নয়, এটি বিশ্ব রাজনীতির বড় পরিবর্তনের সংকেত। রাশিয়ার প্রযুক্তিতে শক্তিশালী হওয়া ইরান এখন মধ্যপ্রাচ্যে এক বড় ফ্যাক্টর। তবে বিশ্বশান্তির স্বার্থে এই অস্ত্রের ব্যবহার যেন কেবল ‘প্রতিরক্ষা’ বা ‘ডিটারেন্স’ হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকে, এটাই সবার প্রত্যাশা।