পৃথিবীর গভীরতম খাত মারিয়ানা ট্রেঞ্চের নিচে আসলে কী আছে?

সমুদ্রের বিশাল জলরাশির নিচে এমন এক জায়গা আছে যেখানে সূর্যের আলো পৌঁছায় না এবং পানির চাপ একজন মানুষকে একটি মশার মতো পিষে ফেলতে পারে। প্রশান্ত মহাসাগরের সেই রহস্যময় জায়গার নাম মারিয়ানা ট্রেঞ্চ (Mariana Trench)। এটি কেন পৃথিবীর সবচেয়ে রহস্যময় স্থান এবং এর তলদেশে কী লুকিয়ে আছে, তা আজকের আর্টিকেলে আমরা উন্মোচন করব।

মারিয়ানা ট্রেঞ্চের গভীরতা কত?

মারিয়ানা ট্রেঞ্চ হলো পৃথিবীর গভীরতম সমুদ্র খাত, যা প্রশান্ত মহাসাগরের পশ্চিম অংশে অবস্থিত। এর সবচেয়ে গভীরতম বিন্দুর নাম ‘চ্যালেঞ্জার ডিপ’ (Challenger Deep), যার গভীরতা প্রায় ১০,৯৮৪ মিটার (৩৫,৮৭৬ ফুট)। এর গভীরতা এতটাই বেশি যে, যদি মাউন্ট এভারেস্টকে এর ভেতরে বসিয়ে দেওয়া হয়, তবে এর চূড়া সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে আরও ২ কিলোমিটার নিচে থাকবে।

মারিয়ানা ট্রেঞ্চের ভৌগোলিক অবস্থান ও বৈশিষ্ট্য

মারিয়ানা দ্বীপপুঞ্জের পাশে অবস্থিত এই খাতটি দেখতে অনেকটা বাঁকানো অর্ধচন্দ্রের মতো।

  • দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ: এটি প্রায় ২,৫৫০ কিলোমিটার লম্বা এবং গড়ে ৬৯ কিলোমিটার চওড়া।
  • পানির চাপ: এর তলদেশে পানির চাপ সমুদ্রপৃষ্ঠের তুলনায় প্রায় ১,০০০ গুণ বেশি। এটি প্রতি বর্গ ইঞ্চিতে প্রায় ৮ টন বা একটি হাতির ওজনের সমান চাপ সৃষ্টি করে।
  • অন্ধকার ও তাপমাত্রা: এখানে কোনো সূর্যের আলো পৌঁছায় না, ফলে এটি ঘুটঘুটে অন্ধকার। পানির তাপমাত্রা হিমাঙ্কের মাত্র সামান্য উপরে (১ থেকে ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস) থাকে।

চ্যালেঞ্জার ডিপের নিচে কী আছে?

বিজ্ঞানীদের মতে, মারিয়ানা ট্রেঞ্চের তলদেশ কোনো সমতল ভূমি নয়। সেখানে রয়েছে অদ্ভুত সব প্রাণ এবং ভূতাত্ত্বিক কাঠামো:

  1. রহস্যময় সামুদ্রিক প্রাণী: এত প্রচণ্ড চাপ ও অন্ধকারেও কিছু অদ্ভুত প্রাণী টিকে আছে। যেমন—স্বচ্ছ শরীর বিশিষ্ট স্নেইলফিশ (Snailfish), দানবীয় অ্যাম্ফিপড এবং জেনোফায়োফোর নামের এককোষী জীব।
  2. কাদার স্তর: চ্যালেঞ্জার ডিপের তলদেশ বালির বদলে মূলত সিলিকা এবং মৃত সামুদ্রিক প্রাণীর কঙ্কাল দিয়ে তৈরি এক ধরণের আঠালো কাদার আস্তরণে ঢাকা।
  3. হাইড্রোথার্মাল ভেন্ট: এখানে কিছু ফাটল আছে যেখান থেকে গরম তরল পদার্থ এবং খনিজ নির্গত হয়, যা চরম প্রতিকূল পরিবেশে কিছু ব্যাকটেরিয়াকে বেঁচে থাকতে সাহায্য করে।

মানুষ কি কখনো সেখানে পৌঁছেছে?

এখন পর্যন্ত মাত্র অল্প কয়েকজন মানুষ সফলভাবে এই খাতের তলদেশে পৌঁছাতে পেরেছেন:

  • ডন ওয়ালশ এবং জ্যাক পিকার্ড (১৯৬০): তারা প্রথম ‘ট্রিয়েস্ট’ নামক সাবমেরিনে করে তলদেশে যান।
  • জেমস ক্যামেরন (২০১২): বিখ্যাত পরিচালক জেমস ক্যামেরন এককভাবে ‘ডিপসি চ্যালেঞ্জার’ সাবমেরিনে করে প্রায় ১১ কিলোমিটার নিচে নামেন।

মারিয়ানা ট্রেঞ্চ নিয়ে সাধারণ জিজ্ঞাসা

মারিয়ানা ট্রেঞ্চে কি কোনো দানবীয় প্রাণী আছে?

না, মুভি বা ফিকশনের মতো কোনো মেগালোডন বা দানবীয় জলচর প্রাণীর অস্তিত্ব সেখানে পাওয়া যায়নি। তবে সেখানে এমন কিছু আণুবীক্ষণিক জীব পাওয়া গেছে যা পৃথিবীর অন্য কোথাও দেখা যায় না।

মাউন্ট এভারেস্ট কি মারিয়ানা ট্রেঞ্চের চেয়ে উঁচু?

না। মাউন্ট এভারেস্টের উচ্চতা ৮,৮৪৮ মিটার, যেখানে মারিয়ানা ট্রেঞ্চের গভীরতা প্রায় ১১,০০০ মিটার। অর্থাৎ এভারেস্টের চেয়েও এটি ২ কিলোমিটারের বেশি গভীর।

মারিয়ানা ট্রেঞ্চে কি প্লাস্টিক পাওয়া গেছে?

দুঃখজনক হলেও সত্য, জেমস ক্যামেরন এবং পরবর্তী অভিযাত্রীরা সেখানে মানুষের ব্যবহৃত প্লাস্টিক বর্জ্য বা পলিথিন খুঁজে পেয়েছেন। এটি পরিবেশ দূষণের এক চরম উদাহরণ।

মারিয়ানা ট্রেঞ্চ কি ভবিষ্যতে আরও গভীর হবে?

এটি টেকটোনিক প্লেটের নড়াচড়ার ওপর নির্ভর করে। টেকটোনিক প্লেটগুলো একে অপরের নিচে প্রবেশ করায় (Subduction) এই গভীরতা সামান্য কম-বেশি হতে পারে।

শেষকথা

মারিয়ানা ট্রেঞ্চ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, পৃথিবীর অনেক অংশই এখনো আমাদের অজানা। এই অন্ধকার শীতল জগৎটি শুধু রহস্যই নয়, বরং প্রাণ আর বিজ্ঞানের এক অনন্য গবেষণাগার। ভবিষ্যতে উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে হয়তো আমরা এই খাতের আরও গভীরে লুকিয়ে থাকা অজানা রহস্যগুলো জানতে পারব।

তথ্যাদি সংগ্রহ ও যাচাই: * ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক ও নাসা (NASA) ওশানোগ্রাফি রিপোর্ট।

লেখক: বিডি সমাচার সায়েন্স ও টেক ডেস্ক

Leave a Comment