বাংলাদেশে বড় ভূমিকম্পের আশঙ্কা: ঢাকা কতটা ঝুঁকিতে এবং আমাদের বাঁচার উপায় কী?

বাংলাদেশে বড় ভূমিকম্পের আশঙ্কা দিন দিন প্রবল হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, গত প্রায় একশ বছরে এই অঞ্চলে বড় কোনো ভূমিকম্প না হওয়ায় মাটির নিচের টেকটনিক প্লেটে বিপুল পরিমাণ শক্তি জমে আছে। সম্প্রতি চলতি মাসেই ১০টি ছোট-মাঝারি কম্পন (যার মধ্যে শুক্রবার জুমার পর ৫.৪ মাত্রার কম্পন অন্যতম) একটি বড় ভূমিকম্পের অশনিসংকেত দিচ্ছে। ঢাকার প্রায় ২১ লাখ ভবনের ৯০ শতাংশই ভূমিকম্প-সহনীয় না হওয়ায় রাজধানী সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।

কেন বাংলাদেশে বড় ধরনের ভূমিকম্পের সতর্কতা দেওয়া হচ্ছে?

সাম্প্রতিক সময়ে ঘন ঘন ভূমিকম্প দেশবাসীকে আতঙ্কিত করে তুলেছে। এর পেছনে বৈজ্ঞানিক ও ভূতাত্ত্বিক কিছু সুস্পষ্ট কারণ রয়েছে:

  • টেকটনিক প্লেটে জমে থাকা শক্তি: গত প্রায় ১০০ বছরে বাংলাদেশ ও এর আশপাশের ফল্ট লাইনগুলোতে (চ্যুতি) বড় ধরনের কোনো শক্তি নির্গত হয়নি। এই জমে থাকা শক্তি যেকোনো সময় প্রলয়ংকরী ভূমিকম্পের রূপ নিতে পারে।
  • ঘন ঘন ছোট কম্পন: চলতি মাসেই দেশে ১০ দফা কম্পন অনুভূত হয়েছে অর্থাৎ গড়ে প্রায় প্রতি দুই দিনে একটি! ছোট এই কম্পনগুলো বড় কোনো বিপদের পূর্বাভাস হতে পারে।
  • সাম্প্রতিক ক্ষয়ক্ষতি: গত বছরের ২১ নভেম্বর নরসিংদীতে ৫.৭ মাত্রার একটি ভূমিকম্প আঘাত হানে, যাতে বেশ কয়েকজনের প্রাণহানির মতো মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। এর রেশ কাটতে না কাটতেই গত শুক্রবার জুমার নামাজের পর ৫.৪ মাত্রার আরেকটি ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে সারাদেশ।

বিশেষজ্ঞদের মতামত কী?

ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ ড. মো. জাহাঙ্গীর আলম চরম সতর্কতা উচ্চারণ করে বলেছেন, “প্লেট বাউন্ডারিতে দীর্ঘকাল ধরে শক্তি জমে থাকলে সেখানে যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের কম্পন ঘটতে পারে।” তাঁর মতে, এই শক্তি রিলিজ হওয়ার একমাত্র পথ হলো ভূমিকম্প।

ঢাকা শহরের অবস্থা: আমরা কতটা প্রস্তুত?

ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল যেখানেই হোক না কেন, সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে রয়েছে রাজধানী ঢাকা। অপরিকল্পিত নগরায়ণই এর প্রধান কারণ।

  • ভবনের সংখ্যা ও উচ্চতা: ঢাকায় বর্তমানে প্রায় ২১ লাখ ভবন রয়েছে। এর মধ্যে ৩০ শতাংশ ভবনের উচ্চতা ছয় তলার বেশি।
  • নির্মাণ ত্রুটি ও ঝুঁকি: আতঙ্কের বিষয় হলো, এই বিপুল সংখ্যক ভবনের প্রায় ৯০ শতাংশই ভূমিকম্প সহনীয় নয়
  • দেশব্যাপী ঝুঁকি: শুধু ঢাকা নয়, সারাদেশেও রয়েছে শত শত ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা, যা মাঝারি মাত্রার কম্পনেই ধসে পড়তে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বারবার ভবনগুলোর কাঠামোগত মূল্যায়ন (Building Assessment) এবং নতুন ভবন নির্মাণে ভূমিকম্প-সহনীয় প্রযুক্তি ব্যবহারের তাগিদ দিচ্ছেন। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই ভয়াবহ পরিস্থিতি মোকাবিলায় এখন পর্যন্ত কোনো সমন্বিত সরকারি প্রস্তুতির ঘোষণা আসেনি।

ভূমিকম্পের সময় ও পরে আমাদের করণীয়

যেহেতু ভূমিকম্প ঠেকানো সম্ভব নয়, তাই সঠিক প্রস্তুতিই পারে জীবন বাঁচাতে। নিচে জীবনরক্ষাকারী কিছু জরুরি পদক্ষেপ দেওয়া হলো:

ভূমিকম্প চলাকালীন সময়ে:

১. ড্রপ, কভার, হোল্ড অন (Drop, Cover, Hold on): কম্পন শুরু হলেই মেঝেতে বসে পড়ুন, মজবুত টেবিল বা ডেস্কের নিচে আশ্রয় নিন এবং শক্ত করে ধরে রাখুন।

২. আতঙ্কিত হয়ে দৌড়াবেন না: বহুতল ভবনে থাকলে সিঁড়ি বা লিফট ব্যবহার করে নিচে নামার চেষ্টা করবেন না।

৩. নিরাপদ স্থান বেছে নিন: জানালার কাঁচ, ভারী আসবাবপত্র এবং ঝুলন্ত বস্তু (ফ্যান, ঝাড়বাতি) থেকে দূরে থাকুন।

৪. বাইরে থাকলে: খোলা মাঠে অবস্থান করুন। বৈদ্যুতিক খুঁটি, বড় গাছ বা উঁচু ভবনের নিচে দাঁড়াবেন না।

ভূমিকম্পের পরে:

  • আফটারশক (Aftershock) বা পরবর্তী ছোট কম্পনের জন্য প্রস্তুত থাকুন।
  • গ্যাস লিক হচ্ছে কিনা চেক করুন এবং মেইন সুইচ বন্ধ করে দিন।
  • গুজবে কান না দিয়ে রেডিও বা নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যমে চোখ রাখুন।

মানুষ আরও যা জানতে চায়

বাংলাদেশে কি বড় ভূমিকম্প হতে পারে?

হ্যাঁ, বিশেষজ্ঞদের মতে টেকটনিক প্লেটে জমে থাকা শক্তির কারণে বাংলাদেশে ৮ থেকে ৯ মাত্রার একটি বড় ভূমিকম্প হওয়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে।

ঢাকার কতগুলো ভবন ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে আছে?

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ঢাকার প্রায় ২১ লাখ ভবনের মধ্যে ৯০ শতাংশ ভবনই ভূমিকম্পের তীব্রতা সহ্য করার মতো করে তৈরি হয়নি।

ঘন ঘন ভূমিকম্প হওয়ার কারণ কী?

মাটির নিচের টেকটনিক প্লেটগুলোর নড়াচড়া এবং আটকে থাকা দীর্ঘদিনের জমে থাকা শক্তি রিলিজ হওয়ার কারণেই সম্প্রতি ঘন ঘন ছোট ও মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প হচ্ছে (যেমন চলতি মাসেই ১০টি)।

সম্প্রতি বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় ভূমিকম্প কবে হয়েছিল?

সাম্প্রতিক রেকর্ডে গত বছরের ২১ নভেম্বর নরসিংদীতে ৫.৭ মাত্রার একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প হয়, যাতে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটে। সর্বশেষ গত শুক্রবারও ৫.৪ মাত্রার কম্পন অনুভূত হয়েছে।

আমার ভবন ভূমিকম্প-সহনীয় কিনা তা কীভাবে বুঝব?

আপনার ভবনটি ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড মেনে তৈরি হয়েছে কিনা, তা যাচাই করতে হবে। এর জন্য রাজউক (RAJUK) বা পেশাদার স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারের মাধ্যমে ভবনের ‘রেট্রোফিটিং’ বা অ্যাসেসমেন্ট করানো জরুরি।

সরকারের কি কোনো প্রস্তুতি আছে?

ফায়ার সার্ভিস ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের কিছু উদ্ধার সরঞ্জাম থাকলেও, বিশেষজ্ঞদের মতে এত বড় বিপর্যয় সামাল দেওয়ার মতো কোনো সমন্বিত ও কার্যকর সরকারি প্রস্তুতি এখনো দৃশ্যমান নয়।

বিশেষ দ্রষ্টব্য: এই আর্টিকেলটি জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছে। ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে সর্বদা দক্ষ প্রকৌশলীর পরামর্শ নিন।

Leave a Comment