বাংলাদেশে হঠাৎ তীব্র শীতের কারণ কী? হাড়কাঁপানো ঠান্ডার পেছনের আসল কারণ

বাংলাদেশে হঠাৎ তীব্র শীত অনুভূত হওয়ার প্রধান কারণ হলো দিন ও রাতের তাপমাত্রার ব্যবধান কমে যাওয়া (৫° সেলসিয়াসের নিচে), হিমালয় অঞ্চল থেকে আসা উচ্চচাপ বলয় এবং উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে প্রবাহিত ঠান্ডা বাতাস। এছাড়া বায়ুমণ্ডলের ‘জেট স্ট্রিম’ নিচে নেমে আসা এবং ঘন কুয়াশার কারণে সূর্যের আলো ভূপৃষ্ঠে পৌঁছাতে না পারায় শীতের তীব্রতা বহুগুণ বেড়ে গেছে।

কেন এবার শীত এত বেশি অনুভূত হচ্ছে?

আবহাওয়াবিদদের মতে, কেবল তাপমাত্রা কমলেই শীত লাগে না, বরং বেশ কিছু বায়ুমণ্ডলীয় পরিবর্তনের কারণে আমরা হাড়কাঁপানো শীত অনুভব করি। নিচে এর প্রধান কারণগুলো ব্যাখ্যা করা হলো:

দিন ও রাতের তাপমাত্রার ব্যবধান কমে যাওয়া

শীতের তীব্রতা নির্ভর করে সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রার পার্থক্যের ওপর।

  • যদি এই পার্থক্য ১০° সেলসিয়াসের নিচে নামে, তবে ঠান্ডা বেশি অনুভূত হয়।
  • বর্তমানে বাংলাদেশের অনেক জায়গায় এই পার্থক্য ৫° সেলসিয়াসের নিচে নেমে এসেছে, যা হাড়কাঁপানো ঠান্ডার মূল কারণ।

হিমালয় থেকে আসা উচ্চচাপ বলয়

পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশ জুড়ে একটি উচ্চচাপ বলয় তৈরি হয়েছে। এর ফলে হিমালয়ের পাদদেশ থেকে আসা অত্যন্ত ঠান্ডা বাতাস উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম দিক দিয়ে সরাসরি বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। এই বাতাসের প্রবাহই শীতকে আরও তীব্র করে তুলেছে।

জেট স্ট্রিম (Jet Stream) নিচে নেমে আসা

বায়ুমণ্ডলের ওপরের স্তরে পশ্চিম থেকে পূর্বে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে এক ধরনের বাতাস প্রবাহিত হয়, যাকে ‘জেট স্ট্রিম’ বলে। বর্তমানে এই জেট স্ট্রিম স্বাভাবিকের চেয়ে কিছুটা নিচের দিক দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে, যার ফলে ওপরের স্তরের ঠান্ডা বাতাস নিচে নেমে আসছে এবং শীত বাড়িয়ে দিচ্ছে।

ঘন কুয়াশার আস্তরণ

মধ্যরাত থেকে বিকেল পর্যন্ত ঘন কুয়াশা থাকায় সূর্যের আলো ভূপৃষ্ঠে পৌঁছাতে পারছে না। কুয়াশার এই স্তরটি ছাঁকনির মতো কাজ করে, যা সূর্যের তাপকে আটকে দেয়। ফলে দিনের বেলাতেও চারপাশ ঠান্ডা থাকে।

সূর্যের স্বল্প কিরণকাল (Kironkaal)

শীতকালে সূর্যের আলো পাওয়ার সময় বা ‘কিরণকাল’ এমনিতেই কম থাকে। সাধারণত এটি ৮-১২ ঘণ্টা হওয়ার কথা থাকলেও ঘন কুয়াশার কারণে বর্তমানে মাত্র ৪-৫ ঘণ্টা সূর্যের আলো দেখা যাচ্ছে। ফলে ভূপৃষ্ঠ উত্তপ্ত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না।

শৈত্যপ্রবাহের ধরন ও তাপমাত্রার হিসাব

বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের নিয়ম অনুযায়ী শৈত্যপ্রবাহকে কয়েক ভাগে ভাগ করা হয়েছে:

শৈত্যপ্রবাহের ধরনতাপমাত্রা (সেলসিয়াস)
মৃদু শৈত্যপ্রবাহ৮° – ১০° সে.
মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ৬° – ৮° সে.
তীব্র শৈত্যপ্রবাহ৪° – ৬° সে.
অতি তীব্র শৈত্যপ্রবাহ৪° সে.-এর নিচে

সাধারণ মানুষের জন্য কিছু জরুরি টিপস

তীব্র শীতে সুস্থ থাকতে নিচের পদক্ষেপগুলো অনুসরণ করতে পারেন:

  • পর্যাপ্ত গরম কাপড় পরুন: বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধদের ক্ষেত্রে কয়েক স্তরে গরম কাপড় ব্যবহার করা ভালো।
  • খাদ্যাভ্যাস: শরীরে উষ্ণতা ধরে রাখতে আদা চা, মধু এবং পুষ্টিকর স্যুপ জাতীয় খাবার খান।
  • কুয়াশায় সতর্কতা: কুয়াশার কারণে দৃষ্টিসীমা কমে যায়, তাই রাস্তায় চলাচলের সময় হেডলাইট ব্যবহার করুন এবং সাবধানে ড্রাইভ করুন।

শীত নিয়ে সাধারণ কিছু প্রশ্ন

প্রশ্ন: জেট স্ট্রিম কী?

উত্তর: জেট স্ট্রিম হলো বায়ুমণ্ডলের ওপরের স্তরে প্রবাহিত এক ধরনের দ্রুতগতিসম্পন্ন বাতাস যা পৃথিবীর আবহাওয়াকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে।

প্রশ্ন: কিরণকাল কমে গেলে কী হয়?

উত্তর: কিরণকাল কমলে সূর্য ভূপৃষ্ঠকে দীর্ঘক্ষণ উত্তপ্ত করতে পারে না, ফলে মাটি ও চারপাশের বাতাস শীতল থেকে যায় এবং শীতের তীব্রতা বাড়ে।

প্রশ্ন: হঠাৎ শীত বাড়লে করণীয় কী?

উত্তর: হঠাৎ শীত বাড়লে ঠান্ডা বাতাস থেকে বাঁচতে কানটুপি ও মাফলার ব্যবহার করুন এবং পর্যাপ্ত পানি পান করুন যাতে ডিহাইড্রেশন না হয়।

তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর ও বিশেষজ্ঞ বিশ্লেষণ।

Leave a Comment