আপডেট: ৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | পড়ার সময়: ৫ মিনিট | লিখেছেন: পলিটিক্যাল অ্যাফেয়ার্স ডেস্ক
বাংলাদেশে জাতীয় বা স্থানীয় নির্বাচন এলেই “রিটার্নিং অফিসার” শব্দটি বারবার শোনা যায়। আপনি কি জানেন একজন রিটার্নিং অফিসারের কাজ কি এবং কেন একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের চাবিকাঠি মূলত তাদের হাতেই থাকে? সহজ কথায়, একটি নির্দিষ্ট নির্বাচনী এলাকায় নির্বাচন আয়োজনের ‘ক্যাপ্টেন’ হলেন এই রিটার্নিং অফিসার।
এই আর্টিকেলে আমরা রিটার্নিং অফিসারের দায়িত্ব, ক্ষমতা, নিয়োগ প্রক্রিয়া এবং নির্বাচন চলাকালীন তাদের ভূমিকা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
একনজরে: রিটার্নিং অফিসারের কাজ কি?
রিটার্নিং অফিসার হলেন নির্বাচন কমিশন কর্তৃক নিযুক্ত একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, যিনি একটি নির্দিষ্ট নির্বাচনী এলাকার (Constituency) সম্পূর্ণ নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বে থাকেন। তার প্রধান কাজগুলো হলো প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র গ্রহণ ও যাচাই-বাছাই করা, বৈধ প্রার্থীদের মাঝে প্রতীক বরাদ্দ দেওয়া, ভোটকেন্দ্র ও ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাদের (প্রিজাইডিং অফিসার) তত্ত্বাবধান করা এবং ভোটগণনা শেষে ওই আসনের চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণা করা। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সাধারণত জেলা প্রশাসকদের (DC) এই পদে নিয়োগ দেওয়া হয়।
রিটার্নিং অফিসার কে এবং তাকে কে নিয়োগ দেন?
বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী, জাতীয় সংসদ বা স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সময় বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন (Election Commission) প্রতিটি আসনের জন্য একজন করে রিটার্নিং অফিসার নিয়োগ দেয়।
- জাতীয় সংসদ নির্বাচন: সাধারণত সংশ্লিষ্ট জেলার জেলা প্রশাসককে (Deputy Commissioner – DC) রিটার্নিং অফিসার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তবে বিশেষ ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব কর্মকর্তাদেরও এই দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে।
- সিটি কর্পোরেশন/পৌরসভা নির্বাচন: এক্ষেত্রে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক বা আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তাদের এই দায়িত্ব দেওয়া হয়।
তার সাহায্য করার জন্য একজন বা একাধিক সহকারী রিটার্নিং অফিসার (সাধারণত উপজেলা নির্বাহী অফিসার বা থানা নির্বাচন অফিসার) থাকেন।
রিটার্নিং অফিসারের প্রধান কাজগুলো কী কী?
একজন রিটার্নিং অফিসারের কাজের পরিধি বিশাল। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা থেকে শুরু করে ফলাফল গেজেট আকারে প্রকাশ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ার তিনি মূল চালিকাশক্তি। নিচে তার কাজগুলো ধাপে ধাপে আলোচনা করা হলো:
১. মনোনয়নপত্র বিতরণ ও গ্রহণ
নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর আগ্রহী প্রার্থীরা রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয় থেকে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেন এবং পূরণ করে জমা দেন। রিটার্নিং অফিসারের প্রথম কাজ হলো নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এই মনোনয়নপত্রগুলো গ্রহণ করা।
২. মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই (Scrutiny)
এটি রিটার্নিং অফিসারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল কাজ। তিনি প্রার্থীদের দেওয়া তথ্যের সত্যতা যাচাই করেন।
- প্রার্থী ঋণখেলাপী কি না।
- হলফনামায় সঠিক তথ্য দেওয়া হয়েছে কি না।
- প্রস্তাবক ও সমর্থকের তথ্য সঠিক কি না।কোনো অসংগতি পেলে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে মনোনয়নপত্র বাতিল (Reject) করার ক্ষমতা রাখেন।
৩. প্রতীক বরাদ্দ (Allocation of Symbols)
যাচাই-বাছাই শেষে বৈধ প্রার্থীদের তালিকা প্রকাশ করা হয়। এরপর যারা মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করেন না, তাদের মধ্যে রিটার্নিং অফিসার আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী প্রতীক বরাদ্দ করেন। দলের প্রার্থীদের জন্য দলীয় প্রতীক এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জন্য ভিন্ন প্রতীক দেওয়া হয়।
৪. ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ
রিটার্নিং অফিসার তার নির্বাচনী এলাকার প্রতিটি ভোটকেন্দ্রের জন্য প্রিজাইডিং অফিসার, সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার এবং পোলিং অফিসার নিয়োগ করেন। সুষ্ঠুভাবে ভোটগ্রহণের জন্য তিনি এই কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও করেন।
৫. নির্বাচনী ফলাফল একীভূতকরণ ও ঘোষণা
ভোটগ্রহণের দিন শেষে প্রতিটি কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার ভোটগণনা করে ফলাফল রিটার্নিং অফিসারের কাছে পাঠান। রিটার্নিং অফিসার তার আওতাধীন সকল কেন্দ্রের ফলাফল যোগ করে (Consolidate) ওই আসনের চূড়ান্ত বেসরকারি ফলাফল ঘোষণা করেন এবং তা নির্বাচন কমিশনে প্রেরণ করেন।
রিটার্নিং অফিসার বনাম প্রিজাইডিং অফিসার
অনেকেই এই দুটি পদকে গুলিয়ে ফেলেন। নিচের ছকটি দেখলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে:
| বিষয় | রিটার্নিং অফিসার | প্রিজাইডিং অফিসার |
| কাজের এলাকা | পুরো একটি সংসদীয় আসন বা নির্বাচনী এলাকা। | শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট ভোটকেন্দ্র। |
| প্রধান দায়িত্ব | মনোনয়নপত্র বাছাই, প্রতীক বরাদ্দ ও চূড়ান্ত ফল ঘোষণা। | ভোটকেন্দ্রে ভোটগ্রহণ পরিচালনা ও গণনা। |
| নিয়োগকারী | নির্বাচন কমিশন। | রিটার্নিং অফিসার। |
নির্বাচন চলাকালীন রিটার্নিং অফিসারের বিশেষ ক্ষমতা
নির্বাচনের সময় রিটার্নিং অফিসারের হাতে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা না থাকলেও তিনি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
- আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ: তিনি পুলিশ, আনসার, বিজিবি বা সেনাবাহিনীর সাথে সমন্বয় করে নির্বাচনী এলাকায় শান্তি বজায় রাখার ব্যবস্থা করেন।
- আচরণবিধি তদারকি: কোনো প্রার্থী নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন করলে তিনি কারণ দর্শানোর নোটিশ (Show Cause) দিতে পারেন এবং নির্বাচন কমিশনের কাছে শাস্তির সুপারিশ করতে পারেন।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী
১. রিটার্নিং অফিসার কি কোনো প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল করতে পারেন?
উত্তর: হ্যাঁ, অবশ্যই। যদি কোনো প্রার্থী ঋণখেলাপী হন, লাভজনক পদে থাকেন বা হলফনামায় মিথ্যা তথ্য দেন, তবে যাচাই-বাছাইয়ের সময় রিটার্নিং অফিসার আইন অনুযায়ী তার মনোনয়নপত্র বাতিল করতে পারেন।
২. রিটার্নিং অফিসারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করা যায় কি?
উত্তর: হ্যাঁ। যদি রিটার্নিং অফিসার কারো মনোনয়নপত্র বাতিল করেন, তবে ওই প্রার্থী নির্বাচন কমিশনে আপিল করতে পারেন। সেখানেও সমাধান না হলে উচ্চ আদালতে যাওয়ার সুযোগ থাকে।
৩. সহকারী রিটার্নিং অফিসারের কাজ কি?
উত্তর: সহকারী রিটার্নিং অফিসার মূলত রিটার্নিং অফিসারকে তার কাজে সহায়তা করেন। উপজেলা পর্যায়ে মনোনয়নপত্র গ্রহণ বা নির্বাচনী সরঞ্জাম বিতরণের কাজগুলো তিনি রিটার্নিং অফিসারের নির্দেশনায় পালন করেন।
৪. নির্বাচনের ফলাফল সরকারিভাবে কে প্রকাশ করে?
উত্তর: রিটার্নিং অফিসার প্রথমে স্থানীয়ভাবে ফলাফল ঘোষণা করেন। এরপর তিনি তা নির্বাচন কমিশনে পাঠান। নির্বাচন কমিশন যাচাই শেষে সেটি সরকারি গেজেট আকারে প্রকাশ করে।
শেষ কথা
সহজ কথায়, রিটার্নিং অফিসারের কাজ হলো একটি নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাঠ প্রস্তুত করা। মনোনয়নপত্র জমা নেওয়া থেকে শুরু করে বিজয়ী প্রার্থীর নাম ঘোষণা—পুরো প্রক্রিয়াটি তার দক্ষ ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভর করে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য রিটার্নিং অফিসারের ভূমিকা অপরিসীম।
তথ্যসূত্র: গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান এবং গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (RPO), ১৯৭২।