শরিফ ওসমান বিন হাদী (যিনি ওসমান হাদী নামে সমধিক পরিচিত) ছিলেন বাংলাদেশের একজন উদীয়মান রাজনীতিবিদ, লেখক এবং ‘ইনকিলাব মঞ্চ’-এর মুখপাত্র। তিনি ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে রামপুরা এলাকার সমন্বয়ক হিসেবে প্রথম আলোচনায় আসেন। পরবর্তীতে আধিপত্যবাদ বিরোধী রাজনীতি ও জাতীয় সরকার গঠনের দাবিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ঢাকায় এক সন্ত্রাসী হামলায় তিনি নিহত হন।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তরুণ নেতৃত্বের অভাব যখন প্রকট, ঠিক তখন ধুমকেতুর মতো আবির্ভাব ঘটেছিল শরিফ ওসমান বিন হাদীর। ২০২৪ সালের পরবর্তী বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক সমীকরণে তিনি ছিলেন অন্যতম প্রধান কারিগর। তার মেধা, সাহসিকতা এবং আপসহীন অবস্থান তাকে সাধারণ মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে দিয়েছিল।
ওসমান হাদী কে ছিলেন?
ওসমান হাদী ১৯৯৩ সালের ৩০ জুন ঝালকাঠি জেলার নলসিটি উপজেলার এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা শরিফ আব্দুল হাদী ছিলেন একজন মাদ্রাসা শিক্ষক ও স্থানীয় ইমাম। তার শিক্ষাজীবন ছিল ধর্মীয় ও আধুনিক শিক্ষার এক চমৎকার সমন্বয়:
- মাদ্রাসা শিক্ষা: নলসিটি ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসা থেকে প্রাথমিক এবং ঝালকাঠি এনএস কামিল মাদ্রাসা থেকে আলিম সম্পন্ন করেন।
- উচ্চশিক্ষা: তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন।
- পেশা: রাজনীতিতে আসার আগে তিনি ‘ইউনিভার্সিটি অফ স্কলার্স’-এ ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
ইনকিলাব মঞ্চ ও রাজনীতির পথচলা
ওসমান হাদী কেবল রাজপথের নেতা ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন চিন্তক। তার হাত ধরেই প্রতিষ্ঠিত হয় ‘ইনকিলাব মঞ্চ’। এই প্ল্যাটফর্মটি মূলত তরুণ প্রজন্মের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়।
ইনকিলাব মঞ্চের মূল লক্ষ্যগুলো ছিল:
- সার্বভৌমত্ব রক্ষা: বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিদেশি হস্তক্ষেপ বা আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া।
- ইনসাফ কায়েম: রাষ্ট্রে ন্যায়বিচার এবং ইনসাফ ভিত্তিক শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা।
- আওয়ামী লীগ বিরোধী আন্দোলন: ২০২৪-এর বিপ্লব পরবর্তী সময়ে ফ্যাসিবাদের বিলোপ এবং দায়ীদের শাস্তির দাবিতে তিনি ছিলেন আপসহীন।
“সীমান্ত বাঁচাতে চাইলে ঘাস খেয়ে হলেও অস্ত্র বানাও” ওসমান হাদীর এই উক্তিটি বাংলাদেশে দেশপ্রেমী তরুণদের মধ্যে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।
সাহিত্য ও লেখালেখি
রাজনীতির বাইরে ওসমান হাদী একজন সুপরিচিত লেখক ও কবি ছিলেন। তিনি মূলত ‘সীমান্ত শরীফ’ ছদ্মনামে লিখতেন। তার উল্লেখযোগ্য কাজগুলো হলো:
- লাব্বাইক লাল শাক পুবের আকাশ: ২০২৪ সালের একুশে বইমেলায় প্রকাশিত তার জনপ্রিয় কাব্যগ্রন্থ।
- চান্স প্লাস: বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি ইচ্ছুকদের জন্য তার লেখা একটি জনপ্রিয় সহায়ক বই।
ঢাকা-৮ আসন ও নির্বাচনী পরিকল্পনা
২০২৫ সালের শেষদিকে ওসমান হাদী ঘোষণা করেছিলেন যে, তিনি আসন্ন ১৩শ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন (মতিঝিল, পল্টন, রমনা, শাহবাগ) থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। তিনি তার নির্বাচনী প্রচারণায় “মুড়ি-বাতাসা” বিতরণ এবং ভোররাতে মসজিদে লিফলেট বিলির মতো ব্যতিক্রমী সব উদ্যোগ নিয়ে জনমনে সাড়া জাগিয়েছিলেন।
সেই ট্র্যাজিক হামলা ও শাহাদাত
ওসমান হাদীর ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা সম্ভবত তার শত্রুদের আতঙ্কিত করেছিল।
- হামলার তারিখ: ১২ ডিসেম্বর, ২০২৫।
- স্থান: বিজয়নগর বক্স কালভার্ট এলাকা, ঢাকা। জুমার নামাজ পড়ে ফেরার পথে মোটরসাইকেলে আসা সন্ত্রাসীরা তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়।
- মৃত্যু: অবস্থার অবনতি হলে তাকে সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। ১৮ ডিসেম্বর রাতে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
সাধারণ মানুষের জিজ্ঞাসা
১. ওসমান হাদী কোন আন্দোলনের জন্য পরিচিত?
ওসমান হাদী ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সমন্বয়ক এবং পরবর্তীতে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র হিসেবে সর্বাধিক পরিচিত।
২. ওসমান হাদীর রাজনৈতিক আদর্শ কী ছিল?
তিনি ইনসাফ কায়েম, জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং যেকোনো ধরনের বিদেশি আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের আদর্শ ধারণ করতেন।
৩. ইনকিলাব মঞ্চ কী?
ইনকিলাব মঞ্চ একটি রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন যা শরিফ ওসমান বিন হাদী প্রতিষ্ঠা করেন। এটি মূলত ন্যায়বিচার ও তরুণ নেতৃত্বের বিকাশে কাজ করে।
৪. ওসমান হাদী কেন মারা যান?
২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর অজ্ঞাত পরিচয় সন্ত্রাসীদের গুলিতে তিনি মাথায় আঘাত পান এবং পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।
কেন ওসমান হাদী স্মরণীয় থাকবেন?
শরিফ ওসমান বিন হাদী কেবল একজন ব্যক্তি নন, তিনি ছিলেন একটি বিপ্লবের স্বপ্নদ্রষ্টা। বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মকে নতুনভাবে স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছেন তিনি। “দ্বিতীয় স্বাধীনতা” রক্ষার যে অঙ্গীকার তিনি নিয়েছিলেন, তা আজও দেশের লক্ষ লক্ষ তরুণের মাঝে প্রেরণা হয়ে টিকে আছে।
তথ্যসূত্র:
- ইনকিলাব টিভি ও সমকাল নিউজের বিশেষ প্রতিবেদন
- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের ডাটাবেজ
- ইনকিলাব মঞ্চ অফিসিয়াল বিবৃতি