হরমুজ প্রণালী কী?
হরমুজ প্রণালী (Strait of Hormuz) হলো পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের মাঝে অবস্থিত একটি সংকীর্ণ জলপথ, যার দুই পাশে ইরান ও ওমান। এই প্রণালী দিয়ে প্রতিদিন বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ এবং এলএনজির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ পরিবাহিত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তথ্য প্রশাসন (EIA) একে ‘বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথ’ বলে অভিহিত করেছে।
হরমুজ প্রণালী কী এবং কোথায় অবস্থিত?
হরমুজ প্রণালী (ফার্সি: تنگه هرمز) হলো পশ্চিম এশিয়ার একটি কৌশলগত জলপথ, যা পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর ও আরব সাগরের সঙ্গে সংযুক্ত করেছে। এটি একদিকে ইরান এবং অন্যদিকে ওমানের মুসান্দাম উপদ্বীপের মাঝে অবস্থিত।
এই প্রণালীর মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে সৌদি আরব, ইরাক, ইরান, কাতার, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইন রপ্তানি করা জ্বালানি তেল ও গ্যাস বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছায়।
হরমুজ প্রণালীর ভৌগোলিক পরিচয়
- দৈর্ঘ্য: প্রায় ৩৩–৩৯ কিলোমিটার
- প্রস্থ: সরুতম অংশে মাত্র ৩ কিলোমিটার, সর্বোচ্চ ৩৯ কিলোমিটার
- অবস্থান: পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের মধ্যবর্তী স্থান
- দুই তীর: পশ্চিম তীর: ইরান; পূর্ব তীর: ওমানের মুসান্দাম উপদ্বীপ
- জাহাজ চলাচলের লেন: প্রবেশ ও বের হওয়ার জন্য পৃথক ২ মাইল প্রশস্ত লেন এবং মাঝে ২ মাইল বাফার জোন
নামের উৎপত্তি কোথা থেকে?
হরমুজ প্রণালীর নামটি পারস্যের রাজা দ্বিতীয় শাপুরের মা ইফরা হুরমিজদ-এর নাম থেকে এসেছে বলে ধারণা করা হয়। তিনি ৩০৯ থেকে ৩৭৯ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত রাজত্ব করেছিলেন। ঐতিহাসিকভাবে হরমুজ একটি সমৃদ্ধ বন্দর শহর ছিল যা মধ্যযুগে মশলা ও রেশম বাণিজ্যের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল।
হরমুজ প্রণালী কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
হরমুজ প্রণালীকে বিশ্বের ‘জ্বালানির গলার নালী’ বা ‘চোক পয়েন্ট’ বলা হয়। কারণ পারস্য উপসাগর থেকে বাইরে যাওয়ার এটিই একমাত্র সমুদ্রপথ। এটি বন্ধ হলে বিশ্বের বিশাল অংশের জ্বালানি সরবরাহ একেবারে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
পরিসংখ্যানে হরমুজ প্রণালীর গুরুত্ব
| 📊 মূল পরিসংখ্যান (২০২৩–২০২৫ সালের তথ্য ভিত্তিক) |
| • প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল জ্বালানি তেল এই প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয় |
| • বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ এই পথে যায় |
| • বিশ্বের মোট এলএনজি রপ্তানির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এই পথ দিয়ে যায় |
| • বার্ষিক প্রায় ৬০ হাজার কোটি মার্কিন ডলার মূল্যের জ্বালানি বাণিজ্য এই পথে সম্পন্ন হয় |
| • জাপানের আমদানিকৃত তেলের তিন-চতুর্থাংশ এই প্রণালী দিয়ে যায় |
| • চীনের আমদানিকৃত তেলের প্রায় ৪৫ শতাংশ হরমুজ হয়ে আসে |
| • তেল রপ্তানিকারক প্রধান দেশ: সৌদি আরব, ইরাক, ইরান, কাতার, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত |
কোন দেশগুলো সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল?
হরমুজ প্রণালী বন্ধ হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে এশিয়ার দেশগুলো। বিশেষ করে:
- জাপান: আমদানিকৃত তেলের ৭৫ শতাংশেরও বেশি আসে এই পথে
- দক্ষিণ কোরিয়া: জ্বালানির বিশাল অংশ এই পথ-নির্ভর
- ভারত: তেল আমদানির উল্লেখযোগ্য অংশ হরমুজ দিয়ে আসে
- চীন: মোট তেল আমদানির প্রায় ৪৫ শতাংশ
- ইউরোপ: মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও গ্যাসের জন্য নির্ভরশীল
- বাংলাদেশ: এলএনজি আমদানির বড় অংশ এবং অপরিশোধিত তেলের ২০ শতাংশ আসে এই পথে
হরমুজ প্রণালী এবং বাংলাদেশ: সরাসরি প্রভাব ও ঝুঁকি
বাংলাদেশ সরাসরি পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশ না হলেও, হরমুজ প্রণালীর ওপর দেশটির জ্বালানি নিরাপত্তা বড় মাত্রায় নির্ভরশীল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই প্রণালী দিয়ে সরবরাহ বিঘ্নিত হলে বাংলাদেশের জ্বালানি, শিল্প ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে গভীর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
বাংলাদেশ কীভাবে হরমুজ-নির্ভর?
- বাংলাদেশের মোট জ্বালানি তেলের আমদানির প্রায় ২০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল, যা হরমুজ প্রণালী হয়ে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে আসে।
- বার্ষিক প্রায় ৬০ লাখ টন এলএনজি আমদানির মধ্যে ৪০ লাখ টনই আসে কাতার থেকে, এবং বাকি অংশ ওমান থেকে — উভয় সোর্সই হরমুজ প্রণালী-নির্ভর।
- ২০২৪-২৫ অর্থবছরে হরমুজ প্রণালী ব্যবহার করে উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে প্রায় ৬০০ কোটি মার্কিন ডলারের পণ্য আমদানি করা হয়েছে।
- ইরাক, ইরান, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরব — এই সাতটি দেশ থেকে পণ্য আমদানিতে বাংলাদেশ এই প্রণালীর ওপর নির্ভরশীল।
সংকট হলে বাংলাদেশে কী ঘটতে পারে?
জ্বালানি খাতে প্রভাব
- প্রতিদিন প্রায় ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি সরবরাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা
- বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যাঘাত এবং লোডশেডিং বৃদ্ধির সম্ভাবনা
- গ্যাসনির্ভর শিল্পকারখানায় উৎপাদন কমে যেতে পারে
- বিকল্প হিসেবে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ বাড়বে
অর্থনৈতিক প্রভাব
- জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে পরিবহন ও উৎপাদন খরচ বাড়বে
- তৈরি পোশাক খাতে উৎপাদন ব্যাহত হলে রপ্তানি আয় কমতে পারে
- মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত প্রবাসী শ্রমিকদের রেমিট্যান্স প্রবাহে প্রভাব পড়তে পারে
- এলএনজির দাম বাড়লে সরকারের ভর্তুকি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে
সাম্প্রতিক পরিস্থিতি (মার্চ ২০২৬)
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালীতে অচলাবস্থা তৈরি হলে বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। তবে শঙ্কার আগেই কাতার ও ওমান থেকে মোট পনেরোটি পণ্যবাহী জাহাজ হরমুজ প্রণালী পেরিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছাতে সক্ষম হয়।
চট্টগ্রাম বন্দরে ওই জাহাজগুলোতে প্রায় সাড়ে ৭ লাখ টন জ্বালানি তেল, এলএনজি ও শিল্পের কাঁচামাল এসেছে, যা সাময়িক স্বস্তি দিয়েছে। তবে বর্তমান মজুতে পরিশোধিত জ্বালানি তেলের ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক সংকট না থাকলেও অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
হরমুজ প্রণালী নিয়ে ভূরাজনীতি ও ইতিহাস
ইরানের নিয়ন্ত্রণ কেন গুরুত্বপূর্ণ?
হরমুজ প্রণালীর উত্তর তীর সম্পূর্ণরূপে ইরানের নিয়ন্ত্রণে। প্রণালীর দুই পাশে যে জলসীমা রয়েছে, তা ইরান ও ওমানের। ফলে ইরান চাইলে এই জলপথ বন্ধ করে দেওয়ার সক্ষমতা রাখে। এই কৌশলগত সুবিধাই ইরানকে পশ্চিমা দেশগুলোর বিরুদ্ধে ‘কার্ড’ হিসেবে ব্যবহার করার সুযোগ দেয়।
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (IRGC) এই প্রণালীতে টহল দেয়। যেকোনো সংঘাতকালীন পরিস্থিতিতে তারা এই পথ বন্ধ করার হুমকি দিয়ে থাকে।
ঐতিহাসিক সংঘাত ও ঘটনাপঞ্জি
- ১৯৫৯ সালে ইরান তার সীমানাসংলগ্ন জলভাগ ১২ নটিক্যাল মাইলে প্রসারিত করে, প্রণালীর আইনি মর্যাদা পরিবর্তন করে।
- ১৯৭২ সালে ওমানও অনুরূপভাবে তার জলসীমা ১২ নটিক্যাল মাইলে প্রসারিত করে। ফলে প্রণালী সম্পূর্ণভাবে দুই দেশের নিয়ন্ত্রণে আসে।
- ১৯৮০-৮৮ সালের ইরান-ইরাক যুদ্ধে ট্যাংকার যুদ্ধ (Tanker War) চলাকালে এই প্রণালীতে জাহাজে হামলা চলে।
- ২০১১-১২ সালে ইরানের পরমাণু কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে নিষেধাজ্ঞার বিপরীতে ইরান প্রণালী বন্ধের হুমকি দেয়।
- ২০১৯ সালে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা চরমে ওঠে; বেশ কয়েকটি তেলবাহী ট্যাংকারে আক্রমণ ঘটে।
- ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি-মার্চে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল-ইরান সংঘাতের কারণে প্রণালীতে অভূতপূর্ব অচলাবস্থা তৈরি হয়।
হরমুজ প্রণালীর বিকল্প আছে কি?
হরমুজ প্রণালী বন্ধ হলে বিকল্প কিছু পথ ব্যবহার করা যেতে পারে, তবে সেগুলো সীমিত এবং ব্যয়বহুল:
- আবু ধাবি পাইপলাইন (সংযুক্ত আরব আমিরাত): ফুজাইরা বন্দরের সঙ্গে সংযুক্ত। সর্বোচ্চ প্রতিদিন ১৫ লাখ ব্যারেল তেল সরবরাহ করা সম্ভব। তবে এটি হরমুজের বিকল্প হওয়ার মতো যথেষ্ট বড় নয়।
- গোরেহ-জাস্ক পাইপলাইন (ইরান): ইরানের নিজস্ব পাইপলাইন যা ওমান উপসাগরে তেল পরিবহন করতে পারে। প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৩ লাখ ৫০ হাজার ব্যারেল পরিবহনযোগ্য।
- ইরাক-তুরস্ক পাইপলাইন: ভূমধ্যসাগরীয় বন্দরে তেল পৌঁছে দেওয়ার বিকল্প পথ, তবে ক্ষমতা সীমিত।
- কেপ অফ গুড হোপ রুট: আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে যাওয়ার পথ, কিন্তু সময় ও খরচ অনেক বেশি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিকল্পগুলো মিলে হরমুজের মাধ্যমে যে পরিমাণ জ্বালানি পরিবহন হয়, তার একটি ক্ষুদ্র অংশও পূরণ করতে পারবে না।
হরমুজ প্রণালী বন্ধ হলে বিশ্বে কী হবে?
বিশ্লেষকরা মনে করেন, হরমুজ প্রণালী বন্ধ হলে বা দীর্ঘমেয়াদী অচলাবস্থা তৈরি হলে বিশ্বের জ্বালানি বাজারে অভূতপূর্ব সংকট দেখা দেবে।
তেলের দামে প্রভাব
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব হিউস্টনের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হরমুজ প্রণালীর অর্ধেক সরবরাহ বন্ধ হলেও তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১৫০ মার্কিন ডলার পর্যন্ত বাড়তে পারে। প্রণালী পুরোপুরি বন্ধ হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে।
বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে বিপর্যয়
- শিপিং কোম্পানিগুলো বিকল্প রুটে যেতে বাধ্য হবে, যাতে সময় ও খরচ উভয়ই বাড়বে।
- জাহাজের বীমা খরচ লাফিয়ে বাড়বে।
- ইউরোপে প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যাবে (২০২৬ সালের সংকটের সময় ইউরোপে গ্যাসের দাম প্রায় ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছিল)।
- উন্নয়নশীল দেশগুলো, বিশেষত আমদানি-নির্ভর এশিয়ান দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
- বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি বেড়ে যাবে।
হরমুজ প্রণালীর আন্তর্জাতিক আইনি মর্যাদা
আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালী একটি ‘ট্রানজিট পাসেজ’ হিসেবে স্বীকৃত। UNCLOS (United Nations Convention on the Law of the Sea) বা জাতিসংঘের সমুদ্র আইন কনভেনশনের অধীনে প্রণালীতে সব দেশের জাহাজ ও বিমানের ‘ট্রানজিট পাসেজ’ অধিকার রয়েছে।
তবে ইরান UNCLOS সমর্থন করলেও তার নিজস্ব ব্যাখ্যা রয়েছে। ইরান দাবি করে যে নিরীহ চলাচলের শর্তে সামরিক জাহাজ প্রণালী ব্যবহার করতে পারবে। এই আইনি বিরোধ দীর্ঘদিন ধরে ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েনের কারণ হয়ে আসছে।
বাংলাদেশের জন্য করণীয় কী?
হরমুজ প্রণালীর ওপর অতিনির্ভরতা কমাতে দেশের জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি কৌশলগত পদক্ষেপের পরামর্শ দিচ্ছেন:
স্বল্পমেয়াদী পদক্ষেপ
- জ্বালানি মজুতের পরিমাণ বাড়ানো এবং কৌশলগত রিজার্ভ তৈরি করা
- বিকল্প সরবরাহকারী দেশ (রাশিয়া, আমেরিকা, আফ্রিকা) থেকে এলএনজি ও তেল আমদানির চুক্তি সম্পাদন
- জ্বালানি সাশ্রয়ী নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন
- শিল্প ও গৃহস্থালি খাতে জ্বালানি রেশনিং পরিকল্পনা প্রস্তুত রাখা
দীর্ঘমেয়াদী পদক্ষেপ
- নবায়নযোগ্য শক্তি — সৌরশক্তি ও বায়ুশক্তি — ব্যাপকভাবে সম্প্রসারণ
- প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বিদ্যুৎ সংযোগ ও গ্যাস পাইপলাইন সংযোগ স্থাপন
- একাধিক উৎস থেকে জ্বালানি আমদানির ‘বৈচিত্র্যময় পোর্টফোলিও’ তৈরি
- বৈশ্বিক ভূরাজনীতিতে নিরপেক্ষ কূটনীতি বজায় রাখা
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
হরমুজ প্রণালী বন্ধ হলে বাংলাদেশে কত দিনের জ্বালানি মজুত থাকবে?
বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় সাড়ে ৩ লাখ টন পরিশোধিত জ্বালানি তেলের মজুত রয়েছে। এলএনজির ক্ষেত্রে কাতার থেকে আসা জাহাজগুলো হরমুজ প্রণালী পার হওয়ার পর চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছাতে প্রায় ৫-৭ দিন সময় লাগে। সংকট স্বল্পমেয়াদী হলে তাৎক্ষণিক বিপর্যয়ের সম্ভাবনা কম, তবে দুই সপ্তাহের বেশি চললে গ্যাস সরবরাহে গুরুতর সমস্যা দেখা দিতে পারে।
হরমুজ প্রণালী কি ইরান একাই বন্ধ করতে পারে?
প্রযুক্তিগতভাবে ইরান হরমুজ প্রণালীতে চলাচল বন্ধ করার সক্ষমতা রাখে, কারণ প্রণালীর উত্তর তীর তাদের নিয়ন্ত্রণে এবং তারা ক্ষেপণাস্ত্র ও মাইনের মাধ্যমে জাহাজ আটকাতে পারে। তবে এটি করলে ইরান নিজেও ব্যাপক অর্থনৈতিক ও সামরিক ক্ষতির মুখে পড়বে, কারণ ইরানের নিজের তেল রপ্তানিও একমাত্র এই পথেই সম্ভব।
হরমুজ প্রণালী দিয়ে প্রতিদিন কতটি জাহাজ চলাচল করে?
স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে প্রতিদিন গড়ে ২০-২৫টি বা তার বেশি বড় ট্যাংকার এই প্রণালী দিয়ে চলাচল করে। এর বাইরে অন্যান্য পণ্যবাহী জাহাজও এই পথ ব্যবহার করে।
হরমুজ প্রণালী নামটি কোথা থেকে এসেছে?
হরমুজ প্রণালীর নাম এসেছে মধ্যযুগীয় ‘হরমুজ’ বন্দর শহর থেকে। প্রচলিত ব্যুৎপত্তি অনুযায়ী নামটি পারস্যের রাজা দ্বিতীয় শাপুরের মা ইফরা হুরমিজদের নামের সঙ্গে সম্পর্কিত।
হরমুজ প্রণালী কি আন্তর্জাতিক জলসীমায় পড়ে?
না। হরমুজ প্রণালী ইরান ও ওমানের জাতীয় জলসীমার মধ্যে অবস্থিত। তবে UNCLOS অনুযায়ী এটি একটি আন্তর্জাতিক ট্রানজিট পাসেজ হিসেবে স্বীকৃত, তাই সব দেশের বাণিজ্যিক জাহাজ এই পথ ব্যবহার করার অধিকার রাখে।
বাংলাদেশের শ্রমিকরা মধ্যপ্রাচ্যে সংকটে পড়লে রেমিট্যান্সে কী প্রভাব পড়বে?
হরমুজ সংকটের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনীতিতে চাপ পড়লে সেখানকার নির্মাণ ও সেবা খাতে কর্মরত বাংলাদেশি প্রবাসী শ্রমিকদের কর্মসংস্থান ঝুঁকিতে পড়তে পারে। তেলের দাম বৃদ্ধি প্রথম দিকে উপসাগরীয় দেশগুলোর রাজস্ব বাড়ালেও দীর্ঘমেয়াদী সামরিক অস্থিরতায় বিনিয়োগ কমলে শ্রমবাজার সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
হরমুজ প্রণালী কোথায় অবস্থিত?
হরমুজ প্রণালী পশ্চিম এশিয়ায়, পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের মধ্যে অবস্থিত। একদিকে ইরান, অন্যদিকে ওমানের মুসান্দাম উপদ্বীপ।
হরমুজ প্রণালীর দৈর্ঘ্য কত?
প্রণালীটি প্রায় ৩৩–৩৯ কিলোমিটার দীর্ঘ। সরুতম অংশে প্রস্থ মাত্র ৩ কিলোমিটার, আর সর্বোচ্চ প্রস্থ ৩৯ কিলোমিটার।
হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের কত শতাংশ তেল যায়?
বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ এবং এলএনজির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়।
ইরান কি হরমুজ প্রণালী বন্ধ করতে পারে?
ইরান প্রযুক্তিগতভাবে সক্ষম, কিন্তু এটি করা ইরানের নিজের জন্যও অর্থনৈতিকভাবে আত্মঘাতী। কারণ ইরানের নিজের তেল ও গ্যাস রপ্তানিও এই পথে নির্ভরশীল। তবে ইরান বারবার এই হুমকি ব্যবহার করেছে কৌশলগত চাপ তৈরির উদ্দেশ্যে।
হরমুজ প্রণালীর বিকল্প কী?
কার্যকর বিকল্প সীমিত। সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবু ধাবি পাইপলাইন দিয়ে সর্বোচ্চ প্রতিদিন ১৫ লাখ ব্যারেল তেল সরবরাহ সম্ভব, যা হরমুজের মোট সরবরাহের মাত্র একটি ক্ষুদ্রাংশ।
বাংলাদেশ কি হরমুজ প্রণালী সংকটে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবে?
হ্যাঁ। বাংলাদেশ এলএনজির জন্য কাতার ও ওমানের ওপর নির্ভরশীল এবং অপরিশোধিত তেলের ২০ শতাংশ আসে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে — উভয় সরবরাহ লাইনই হরমুজ প্রণালী দিয়ে আসে।
তথ্যসূত্র: মার্কিন জ্বালানি তথ্য প্রশাসন (EIA), জাতিসংঘ আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন সংস্থা (IMO), প্রথম আলো, বিডিনিউজ২৪, দেশ রূপান্তর, ইত্তেফাক, ঢাকা পোস্ট, বাংলা ট্রিবিউন, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (BPC), পেট্রোবাংলা, রয়টার্স, আল-জাজিরা, ব্রিটানিকা এনসাইক্লোপিডিয়া এবং উইকিপিডিয়া (বাংলা সংস্করণ)।
⚠️ দ্রষ্টব্য: হরমুজ প্রণালীর পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তনশীল। সর্বশেষ তথ্যের জন্য বিশ্বস্ত সংবাদমাধ্যম অনুসরণ করুন।