প্রিজাইডিং অফিসার এর কাজ কি? নির্বাচন পরিচালনায় ক্ষমতা ও দায়িত্ব

একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনে ভোটকেন্দ্রের প্রধান চালিকাশক্তি হলেন প্রিজাইডিং অফিসার। আপনি যদি নির্বাচনী দায়িত্বে থাকেন বা নির্বাচনী প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে চান, তবে এই আর্টিকেলটি আপনার জন্য। এখানে আমরা প্রিজাইডিং অফিসারের দায়িত্ব, ক্ষমতা এবং চ্যালেঞ্জগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছি।

একনজরে: প্রিজাইডিং অফিসারের প্রধান কাজ

প্রিজাইডিং অফিসার (Presiding Officer) হলেন একটি নির্দিষ্ট ভোটকেন্দ্রের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী বা প্রধান কর্মকর্তা। তার প্রধান কাজ হলো নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা মেনে ভোটকেন্দ্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা, সহকারী প্রিজাইডিং ও পোলিং অফিসারদের তত্ত্বাবধান করা, সঠিক সময়ে ভোট গ্রহণ শুরু ও শেষ করা এবং ভোট গণনা শেষে ফলাফল রিটার্নিং অফিসারের কাছে হস্তান্তর করা।

প্রিজাইডিং অফিসারের মূল কাজ হলো নির্বাচনী মালামাল সংগ্রহ করে কেন্দ্রে পৌঁছানো, পোলিং এজেন্ট নিয়োগ নিশ্চিত করা, ভোটারদের পরিচয় যাচাইয়ে সহায়তা করা এবং কোনো অরাজকতা ছাড়াই ভোট গ্রহণ সম্পন্ন করা। ভোট শেষে তিনি কেন্দ্রেই ভোট গণনা করেন এবং ফরম-১৬ (ফলাফল বিবরণী) পূরণ করে রিটার্নিং অফিসারের নিকট জমা দেন।

প্রিজাইডিং অফিসারের দায়িত্ব ও কর্তব্য

একজন প্রিজাইডিং অফিসারের কাজকে মূলত তিনটি প্রধান ধাপে ভাগ করা যায়। নিচে প্রতিটি ধাপের বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

১. ভোটগ্রহণের আগের দিনের প্রস্তুতি (Pre-Voting Duties)

ভোটের দিন সকালের আগেই একজন প্রিজাইডিং অফিসারের কাজ শুরু হয়ে যায়।

  • মালামাল সংগ্রহ: রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয় থেকে ব্যালট পেপার (বা ইভিএম), ব্যালট বাক্স, অমোচনীয় কালি, এবং বিভিন্ন ফরম বুঝে নেওয়া।
  • নিরাপত্তা নিশ্চিত করা: পুলিশ ও আনসার বাহিনীর সহায়তায় নির্বাচনী মালামাল নিরাপদে ভোটকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া।
  • কেন্দ্র প্রস্তুতকরণ: ভোটকক্ষ (Polling Booth) এমনভাবে সাজানো যাতে ভোটাররা গোপনে ভোট দিতে পারেন।
  • টিম ব্রিফিং: সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার (APO) এবং পোলিং অফিসারদের (PO) তাদের দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়া।

২. ভোটের দিনের কার্যক্রম (Election Day Duties)

ভোটের দিনটিই হলো সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং। এসময় প্রিজাইডিং অফিসারকে অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হয়।

  • ভোট গ্রহণ শুরু: নির্দিষ্ট সময়ে (সাধারণত সকাল ৮টা) পোলিং এজেন্টদের সামনে খালি ব্যালট বাক্স দেখিয়ে লক করা এবং ভোট শুরু করা।
  • আইনশৃঙ্খলা রক্ষা: কেন্দ্রের ভেতর কোনো বিশৃঙ্খলা হলে তা নিয়ন্ত্রণ করা। প্রয়োজনে তিনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে গুলি চালানোর নির্দেশ পর্যন্ত দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন (ম্যাজিস্ট্রেটের অনুপস্থিতিতে চরম পরিস্থিতিতে)।
  • এজেন্টদের তদারকি: প্রার্থীদের পোলিং এজেন্টরা যাতে কোনো ভোটারকে প্রভাবিত করতে না পারে, তা নিশ্চিত করা।
  • টেন্ডার ও চ্যালেঞ্জ ভোট: যদি কোনো ভুয়া ভোটার শনাক্ত হয়, তবে চ্যালেঞ্জ ভোটের ব্যবস্থা করা এবং টেন্ডার ভোটের হিসাব রাখা।

৩. ভোট গণনা ও ফলাফল ঘোষণা (Post-Voting Duties)

ভোট গ্রহণ শেষ হওয়ার পর প্রিজাইডিং অফিসারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ শুরু হয়।

  • ভোট গণনা: পোলিং এজেন্টদের উপস্থিতিতে ভোট গণনা শুরু করা।
  • বাতিল ভোট যাচাই: কোন ভোটগুলো বাতিল বলে গণ্য হবে, তা নির্বাচন কমিশনের গাইডলাইন অনুযায়ী যাচাই করা।
  • ফলাফল তৈরি: ভোট গণনা শেষে নির্দিষ্ট ফরমে (যেমন: ফরম ১৬) ফলাফল লিপিবদ্ধ করা এবং এজেন্টদের স্বাক্ষর নেওয়া।
  • মালামাল জমা: সমস্ত নির্বাচনী নথিপত্র এবং মালামাল সিলগালা করে রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয়ে জমা দেওয়া।

প্রিজাইডিং অফিসার বনাম সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার:

অনেকেই এই দুটি পদের কাজ গুলিয়ে ফেলেন। নিচের ছকটি দেখলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে:

বিষয়প্রিজাইডিং অফিসার (PRO)সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার (APO)
মূল দায়িত্বপুরো ভোটকেন্দ্রের প্রধান।একটি নির্দিষ্ট বুথ বা কক্ষের দায়িত্বে থাকেন।
ক্ষমতাভোট বন্ধ বা বাতিলের সুপারিশ করতে পারেন।প্রিজাইডিং অফিসারের নির্দেশ মেনে চলেন।
কাগজপত্রফলাফল শিট তৈরি করেন।ব্যালট পেপার ইস্যু করেন এবং আঙুলে কালি দেন।

প্রিজাইডিং অফিসারের বিশেষ ক্ষমতা

গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (RPO), ১৯৭২ অনুযায়ী একজন প্রিজাইডিং অফিসারকে ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার বা বিশেষ ক্ষমতা দেওয়া হয়।

১. তিনি ভোটকেন্দ্রের ৪০০ গজের মধ্যে যেকোনো বেআইনি সমাবেশ ছত্রভঙ্গ করতে পারেন।

২. কেউ ভোটদানে বাধা দিলে বা বিশৃঙ্খলা করলে তাকে পুলিশের হাতে তুলে দিতে পারেন।

৩. পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে গেলে তিনি ভোট গ্রহণ সাময়িক বন্ধ রাখতে পারেন।

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

১. প্রিজাইডিং অফিসার কি ভোট দিতে পারেন?

উত্তর: হ্যাঁ, প্রিজাইডিং অফিসার নিজেও একজন ভোটার। তবে তিনি যে আসনে নির্বাচনী দায়িত্বে আছেন, সেই আসনের ভোটার হলে তিনি পোস্টাল ব্যালট (Postal Ballot) এর মাধ্যমে আগেই নিজের ভোট দিতে পারেন।

২. প্রিজাইডিং অফিসারের সম্মানি কত?

উত্তর: এটি নির্বাচন কমিশন কর্তৃক নির্ধারিত হয় এবং নির্বাচনভেদে ভিন্ন হতে পারে। জাতীয় নির্বাচনে সাধারণত প্রিজাইডিং অফিসারদের যাতায়াত ও আপ্যায়ন বাবদ একটি নির্দিষ্ট অংকের ভাতা (যেমন: ৩০০০-৫০০০ টাকা বা তার বেশি) প্রদান করা হয়।

৩. ভোটকেন্দ্রে কোনো সমস্যা হলে প্রিজাইডিং অফিসার কার সাথে যোগাযোগ করবেন?

উত্তর: কোনো জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে রিটার্নিং অফিসার, এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট বা স্ট্রাইকিং ফোর্সের সাথে যোগাযোগ করবেন।

উপসংহার

পরিশেষে বলা যায়, প্রিজাইডিং অফিসার হলেন নির্বাচন প্রক্রিয়ার মেরুদণ্ড। তার সততা, দক্ষতা এবং তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতার ওপরই নির্ভর করে একটি কেন্দ্রের সুষ্ঠু নির্বাচন। আপনি যদি ভবিষ্যতে এই দায়িত্ব পালন করতে যান, তবে নির্বাচন কমিশনের হ্যান্ডবুকটি ভালো করে পড়ে নেওয়া এবং মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকা অত্যন্ত জরুরি।

তথ্যসূত্র:

১. গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (RPO), ১৯৭২।

২. বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন (ECS) প্রশিক্ষণ ম্যানুয়াল।

Leave a Comment