সহকারী প্রিজাইডিং অফিসারের কাজ কি?

নির্বাচনের দিন একটি ভোটকেন্দ্র সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য প্রিজাইডিং অফিসারের পরেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার (Assistant Presiding Officer – APO)। আপনি কি আসন্ন নির্বাচনে সহকারী প্রিজাইডিং অফিসারের দায়িত্ব পেয়েছেন? অথবা এই পদের ক্ষমতা ও কাজ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চান?

আজকে আমরা সহজ বাংলায় জানবো একজন সহকারী প্রিজাইডিং অফিসারের মূল কাজ, ভোটের দিন তার করণীয় এবং তার আইনি ক্ষমতা সম্পর্কে।

সহকারী প্রিজাইডিং অফিসারের কাজ কি?

সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার হলেন একটি নির্দিষ্ট ভোট গ্রহণ কক্ষের (Polling Booth) প্রধান। তার মূল কাজ হলো প্রিজাইডিং অফিসারের নির্দেশ মেনে ওই নির্দিষ্ট বুথের শৃঙ্খলা রক্ষা করা, ভোটারদের পরিচয় শনাক্ত করা, পোলিং এজেন্টদের তদারকি করা এবং সুষ্ঠুভাবে ব্যালট পেপার বা ইভিএম-এর মাধ্যমে ভোট গ্রহণ নিশ্চিত করা। ভোট গণনা শেষে ফলাফল বিবরণী প্রস্তুত করাও তার অন্যতম দায়িত্ব।

ভোটের আগের দিন ও প্রস্তুতিমূলক কাজ

একজন সহকারী প্রিজাইডিং অফিসারের দায়িত্ব ভোটের দিন শুরু হয় না, বরং ভোটের আগের দিন থেকেই তাকে সতর্ক থাকতে হয়।

  • নিয়োগপত্র ও প্রশিক্ষণ: নির্বাচন কমিশন থেকে পাওয়া নিয়োগপত্র বুঝে নেওয়া এবং কমিশনের আয়োজিত প্রশিক্ষণ কর্মশালায় অংশগ্রহণ করা।
  • মালামাল গ্রহণ: প্রিজাইডিং অফিসারের সাথে থেকে ব্যালট পেপার, ব্যালট বক্স, ইভিএম (EVM), অমোচনীয় কালি, এবং অন্যান্য নির্বাচনী সামগ্রী বুঝে নেওয়া।
  • ভোটকেন্দ্র প্রস্তুতকরণ: ভোটের আগের দিন কেন্দ্রে পৌঁছে নিজের জন্য বরাদ্দকৃত ভোটকক্ষ (Booth) গুছিয়ে নেওয়া। গোপন কক্ষ (Secret Room) এমনভাবে স্থাপন করা যাতে ভোটারের গোপনীয়তা বজায় থাকে।

ভোটের দিন সকালের কাজ (ভোট শুরুর পূর্বে)

ভোট শুরুর ঠিক আগের মুহূর্তটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ে আপনার করণীয়:

  • এজেন্টদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা: সকাল ৮টার আগেই পোলিং এজেন্টদের নির্দিষ্ট আসনে বসানো এবং তাদের নিয়োগপত্র যাচাই করা।
  • খালি বাক্স/মেশিন প্রদর্শন: পোলিং এজেন্টদের সামনে ব্যালট বাক্স বা ইভিএম মেশিন যে খালি বা শূন্য (Zero Vote) অবস্থায় আছে, তা দেখিয়ে নিশ্চিত করা।
  • আইনশৃঙ্খলা রক্ষা: আপনার বুথের সামনে ভোটাররা যেন সুশৃঙ্খলভাবে লাইনে দাঁড়ায়, তা নিশ্চিত করতে পুলিশ বা আনসার সদস্যদের নির্দেশ দেওয়া।

ভোট চলাকালীন মূল দায়িত্ব

ভোট চলাকালীন সময়টিই একজন সহকারী প্রিজাইডিং অফিসারের জন্য সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং। এই প্রক্রিয়াটি সাধারণত ৩টি ধাপে সম্পন্ন হয়:

ধাপ ১: ভোটার শনাক্তকরণ

ভোটার যখন কক্ষে প্রবেশ করবেন, পোলিং অফিসারের সহায়তায় ভোটার তালিকা দেখে তার নাম ও ক্রমিক নম্বর জোরে ঘোষণা করতে হবে যাতে পোলিং এজেন্টরা শুনতে পান। কারো আপত্তি না থাকলে পরবর্তী ধাপে যাবেন।

ধাপ ২: অমোচনীয় কালি ও ব্যালট ইস্যু

  • ভোটারের বাম হাতের তর্জনীতে অমোচনীয় কালি লাগিয়ে দেওয়া নিশ্চিত করবেন।
  • ব্যালট পেপারের মুড়িতে ভোটারের আঙুলের ছাপ বা স্বাক্ষর নেবেন।
  • এরপর ব্যালট পেপারে অফিসিয়াল সিল ও স্বাক্ষর দিয়ে ভোটারের হাতে দেবেন (ইভিএম হলে ব্যালট ইউনিট ওপেন করে দেবেন)।

ধাপ ৩: ভোট প্রদান নিশ্চিত করা

ভোটার যেন গোপন কক্ষে গিয়ে নিরাপদে ভোট দিতে পারেন, সেদিকে নজর রাখবেন। তবে মনে রাখবেন, গোপন কক্ষে ভোটার ছাড়া অন্য কেউ প্রবেশ করতে পারবে না, এমনকি আপনিও না (বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন ভোটার ছাড়া)।

সহকারী প্রিজাইডিং অফিসারের ক্ষমতা

নির্বাচন কমিশন আইন অনুযায়ী আপনার হাতে বেশ কিছু ক্ষমতা ন্যস্ত থাকে:

  1. বুথের নিয়ন্ত্রণ: আপনার নির্দিষ্ট ভোটকক্ষের সর্বময় কর্তা আপনি। প্রিজাইডিং অফিসারের অনুমতি সাপেক্ষে আপনি যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
  2. অবাঞ্ছিত ব্যক্তি অপসারণ: যদি কোনো ব্যক্তি বা পোলিং এজেন্ট ভোটগ্রহণে বাধার সৃষ্টি করে, তবে আপনি তাকে কক্ষ থেকে বের করে দেওয়ার সুপারিশ করতে পারেন।
  3. পোলিং অফিসারদের পরিচালনা: আপনার অধীনে থাকা ২ জন পোলিং অফিসারের কাজ তদারকি করা আপনার দায়িত্ব।

ভোট গ্রহণ শেষে ও গণনার কাজ

বিকেল ৪টা বা নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার পর আপনার কাজ হলো:

  • ভোট গণনা: পোলিং এজেন্টদের উপস্থিতিতে ব্যালট বা ইভিএম-এর ভোট গণনা করা।
  • ফলাফল বিবরণী: নির্ভুলভাবে ফলাফল শিট (ফরম) পূরণ করা এবং পোলিং এজেন্টদের স্বাক্ষর নেওয়া।
  • মালামাল হস্তান্তর: ব্যবহৃত ও অব্যবহৃত সকল নির্বাচনী সামগ্রী প্রিজাইডিং অফিসারের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া।

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী

সহকারী প্রিজাইডিং ও পোলিং অফিসারের মধ্যে পার্থক্য কি?

সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার একটি নির্দিষ্ট বুথ বা কক্ষের দায়িত্বে থাকেন এবং পোলিং অফিসারদের নেতা হিসেবে কাজ করেন। অন্যদিকে, পোলিং অফিসাররা তাকে সহায়তা করেন, যেমন কালি লাগানো বা ভোটার তালিকায় দাগ দেওয়া।

ইভিএম (EVM) এ সহকারী প্রিজাইডিং অফিসারের কাজ কি?

ইভিএম পদ্ধতিতে সহকারী প্রিজাইডিং অফিসারের কাছে ‘কন্ট্রোল ইউনিট’ থাকে। তিনি ব্যালট বাটন চেপে ভোটারকে ভোট দেওয়ার অনুমতি (Access) দেন।

কোনো ভোটারকে সন্দেহ হলে কি করবেন?

যদি কোনো ভোটারের পরিচয় নিয়ে পোলিং এজেন্টরা চ্যালেঞ্জ করে (Challenge Vote), তবে আপনাকে নির্দিষ্ট ফি জমা নিয়ে সংক্ষিপ্ত তদন্তের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে তিনি প্রকৃত ভোটার কিনা।

শেষকথা

একজন সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার সুষ্ঠু নির্বাচনের অন্যতম চাবিকাঠি। আপনার সততা, নিরপেক্ষতা এবং দক্ষতাই একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দিতে পারে। আশা করি এই গাইডটি আপনার দায়িত্ব পালনে সহায়ক হবে।

বিঃদ্রঃ নির্বাচনের আইন ও বিধিমালা পরিবর্তনশীল। সর্বশেষ নির্দেশনার জন্য সর্বদা নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের অফিসিয়াল গাইডবুক অনুসরণ করুন।

Leave a Comment