তারাবিহ নামাজের নিয়ত, নিয়ম, দোয়া ও মোনাজাত (বাংলা ও আরবি)

পবিত্র রমজান মাসের অন্যতম প্রধান ইবাদত হলো তারাবিহ নামাজ। সারাদিন রোজা রাখার পর রাতের বেলায় তারাবিহ নামাজ আদায় করা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ। কিন্তু অনেকেই তারাবিহ নামাজের নিয়ত আরবি ও বাংলা, সঠিক নিয়ম এবং দোয়া ও মোনাজাত নিয়ে দ্বিধায় ভোগেন।

তারাবিহ নামাজের নিয়ত ও নিয়ম

  • তারাবিহ নামাজের নিয়ত বাংলা: “আমি কেবলামুখী হয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে দুই রাকাত তারাবিহর সুন্নতে মুয়াক্কাদা নামাজ আদায় করার নিয়ত করছি, আল্লাহু আকবার।” (জামাতে পড়লে যুক্ত করবেন: ‘এই ইমামের পেছনে’)।
  • নামাজের ধরন: তারাবিহ নামাজ সুন্নাতে মুয়াক্কাদা (সুন্নত)।
  • পড়ার নিয়ম: এশার ফরজ ও সুন্নত নামাজের পর এবং বিতর নামাজের আগে দুই দুই রাকাত করে মোট ২০ রাকাত নামাজ আদায় করতে হয়। প্রতি ৪ রাকাত পরপর একটু বিশ্রাম নিয়ে তারাবিহর দোয়া পড়তে হয়।

তারাবিহ নামাজ সুন্নত নাকি নফল বিস্তারিত

অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে, তারাবিহ নামাজ আসলে কী? এটি কি ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নত নাকি নফল?

ইসলামিক শরীয়ত অনুযায়ী, নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্য তারাবিহ নামাজ সুন্নাতে মুয়াক্কাদা। অর্থাৎ, এটি এমন একটি সুন্নত যা রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজে গুরুত্বের সাথে পালন করেছেন এবং সাহাবায়ে কেরামকেও পালনের নির্দেশ দিয়েছেন। কোনো বিশেষ কারণ ছাড়া ইচ্ছাকৃতভাবে তারাবিহ নামাজ ছেড়ে দেওয়া গুনাহের কাজ। তবে এটি ফরজ বা ওয়াজিব নয়। তাই কেউ যদি কোনো দিন পড়তে না পারেন, তবে তার কাজা আদায় করতে হয় না, তবে তিনি রমজানের বিশেষ সওয়াব থেকে বঞ্চিত হবেন।

তারাবিহ নামাজের নিয়ত আরবি ও বাংলা

নামাজের জন্য অন্তরের ইচ্ছাই মূল নিয়ত। তবে মুখে উচ্চারণ করা উত্তম। নিচে আরবি ও বাংলায় নিয়ত দেওয়া হলো:

তারাবিহ নামাজের নিয়ত (আরবি)

نَوَيْتُ اَنْ اُصَلِّىَ لِلَّهِ تَعَالَى رَكْعَتَىْ صَلَوةِ التَّرَاوِيْحِ سُنَّةُ رَسُوْلِ اللَّهِ تَعَالَى مُتَوَجِّهًا اِلَى جِهَةِ الْكَعْبَةِ الشَّرِيْفَةِ اَللَّهُ اَكْبَرُ

তারাবিহ নামাজের নিয়ত বাংলা উচ্চারণ

“নাওয়াইতু আন উসাল্লিয়া লিল্লাহি তা’য়ালা, রাকাআতাই সালাতিত তারাবিহ, সুন্নাতু রাসূলিল্লাহি তা’য়ালা, মুতাওয়াজ্জিহান ইলা জিহাতিল কা’বাতিশ শারিফাতি, আল্লাহু আকবার।”

(বি.দ্র: আপনি যদি জামাতে নামাজ পড়েন, তবে নিয়তের সাথে “ইকতাদাইতু বিহাযাল ইমাম” বা বাংলায় “এই ইমামের পেছনে পড়ছি” কথাটি যুক্ত করে নেবেন।)

তারাবিহ নামাজের নিয়ম ধাপে ধাপে

বাংলাদেশ সহ বিশ্বব্যাপী হানাফি মাজহাব অনুযায়ী তারাবিহ নামাজের নিয়ম নিচে ধাপে ধাপে আলোচনা করা হলো:

১. প্রস্তুতি ও সময়: এশার ৪ রাকাত ফরজ ও ২ রাকাত সুন্নত নামাজের পর বিতর নামাজের আগে তারাবিহ নামাজ পড়তে হয়।

২. রাকাত সংখ্যা: দুই রাকাত করে করে নিয়ত বেঁধে মোট ২০ রাকাত তারাবিহ নামাজ আদায় করতে হয়।

৩. কেরাত পড়া: অন্য যেকোনো সাধারণ ২ রাকাত সুন্নত নামাজের মতোই সূরা ফাতিহার সাথে অন্য সূরা মিলিয়ে নামাজ পড়তে হয়। (খতম তারাবিহ হলে হাফেজ সাহেবরা কোরআন থেকে তেলাওয়াত করেন)।

৪. বিশ্রাম বা তারবিহা: প্রতি ৪ রাকাত (অর্থাৎ ২ বার সালাম ফেরানোর) পর বসে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেওয়া সুন্নত। এই বিশ্রামের সময়টুকুতেই মূলত তারাবিহর দোয়া পড়া হয়।

তারাবিহ নামাজের দোয়া বাংলা উচ্চারণসহ

প্রতি ৪ রাকাত অন্তর বসে যে দোয়াটি পড়া হয়, তা নিচে দেওয়া হলো:

আরবি: > سُبْحانَ ذِي الْمُلْكِ وَالْمَلَكُوتِ سُبْحانَ ذِي الْعِزَّةِ وَالْعَظَمَةِ وَالْهَيْبَةِ وَالْقُدْرَةِ وَالْكِبْرِيَاءِ وَالْجَبَرُوتِ سُبْحَانَ الْمَلِكِ الْحَيِّ الَّذِي لَا يَنَامُ وَلَا يَمُوتُ اَبَدًا اَبَدًا سُبُّوحٌ قُدُّوْسٌ رَبُّنَا وَرَبُّ الْمَلَائِكَةِ وَالرُّوْحِ

বাংলা উচ্চারণ: > “সুবহানা যিল মুলকি ওয়াল মালাকূতি, সুবহানা যিল ইয্যাতি ওয়াল আযমাতি ওয়াল হাইবাতি ওয়াল কুদরাতি ওয়াল কিবরিয়ায়ি ওয়াল জাবারূত। সুবহানাল মালিকিল হায়্যিল্লাযী লা-ইয়ানামু ওয়ালা ইয়ামূতু আবাদান আবাদা। সুব্বূহুন কুদ্দূসুন রাব্বুনা ওয়া রাব্বুল মালায়িকাতি ওয়ার রূহ।”

তারাবিহ নামাজের মোনাজাত আরবি বাংলা

২০ রাকাত নামাজ শেষ হওয়ার পর (অথবা অনেকে প্রতি ৪ রাকাত পরপরও পড়ে থাকেন) যে মোনাজাত করা হয়, সেটি নিচে দেওয়া হলো:

তারাবিহ নামাজের মোনাজাত আরবি:

اَللَّهُمَّ اِنَّا نَسْأَلكَ الْجَنَّةَ وَ نَعُوْذُبِكَ مِنَ النَّارِ يَا خَالِقَ الْجَنَّةِ وَالنَّارِ بِرَحْمَتِكَ يَاعَزِيْزُ يَاغَفَّارُ يَاكَرِيْمُ يَاسَتَّارُ يَارَحِيْمُ يَاجَبَّارُ يَاخَالِقُ يَابَارُّ اَللَّهُمَّ اَجِرْنَا مِنَ النَّارِ يَا مُجِيْرُ يَامُجِيْرُ يَا مُجِيْرُ بِرَحْمَتِكَ يَا اَرْحَمَ الرَّحِمِيْنَ

তারাবিহ নামাজের মোনাজাত বাংলা উচ্চারণ:

“আল্লাহুম্মা ইন্না নাসআলুকাল জান্নাতা ওয়া নাউযুবিকা মিনান নারি। ইয়া খালিক্বাল জান্নাতি ওয়ান নারি বিরাহমাতিকা ইয়া আযীযু ইয়া গাফফার, ইয়া কারীমু ইয়া সাত্তার, ইয়া রাহীমু ইয়া জাব্বার, ইয়া খালিকু ইয়া বাররু। আল্লাহুম্মা আজিরনা মিনান নারি, ইয়া মুজীরু, ইয়া মুজীরু, ইয়া মুজীর। বিরাহমাতিকা ইয়া আরহামার রাহিমীন।”

প্রাসঙ্গিক প্রশ্নোত্তর

১. মহিলাদের তারাবিহ নামাজের নিয়ম কি?

মহিলাদের তারাবিহ নামাজের নিয়ম পুরুষদের মতোই। তারা ঘরে বসে একাকী দুই রাকাত করে করে মোট ২০ রাকাত তারাবিহ আদায় করবেন। প্রতি ৪ রাকাত পর পর বিশ্রাম নেবেন এবং দোয়া পড়বেন।

২. তারাবিহ নামাজের দোয়া মুখস্থ না থাকলে কী পড়ব?

আপনার যদি নির্দিষ্ট দোয়াটি মুখস্থ না থাকে, তবে চিন্তার কিছু নেই। ৪ রাকাত পর বিশ্রামের সময় আপনি দরুদ শরীফ, ইস্তেগফার (আস্তাগফিরুল্লাহ) বা সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহু আকবার পড়তে পারেন। চুপ করে বসে থাকলেও কোনো গুনাহ হবে না।

৩. তারাবিহ নামাজ কি একা একা পড়া যায়?

হ্যাঁ, তারাবিহ নামাজ একাকী পড়া জায়েজ। তবে মসজিদে গিয়ে জামাতের সাথে আদায় করা অধিক সওয়াবের এবং সুন্নাতে মুয়াক্কাদা আলাল কিফায়া (এলাকার কেউ জামাতে না পড়লে সবাই গুনাহগার হবে)।

৪. তারাবিহ নামাজ কয় রাকাত? (৮ নাকি ২০)

বাংলাদেশ সহ উপমহাদেশে এবং মক্কা-মদিনায় যুগ যুগ ধরে ২০ রাকাত তারাবিহ আদায় করা হয়, যা হজরত উমর (রা.) এর সময় থেকে সাহাবাদের ইজমা দ্বারা প্রমাণিত। তবে কিছু ইসলামিক স্কলার সহিহ হাদিসের ভিত্তিতে ৮ রাকাত পড়ার কথাও বলেন। আপনার শারীরিক সামর্থ্য ও এলাকার মসজিদের নিয়ম অনুযায়ী আদায় করতে পারেন, তবে হানাফি মাজহাব মতে ২০ রাকাত সুন্নাত।

শেষকথা

পবিত্র রমজানে তারাবিহ নামাজ আমাদের অন্তরকে প্রশান্ত করে এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভে সাহায্য করে। আশা করি, তারাবিহ নামাজের মোনাজাত বাংলা, নিয়ত ও নিয়ম সম্পর্কে আপনার আর কোনো কনফিউশন নেই। এই বিষয়ে আপনার আরও কোনো প্রশ্ন থাকলে নিচে কমেন্ট সেকশনে জানাতে পারেন। আল্লাহ আমাদের সবাইকে সঠিকভাবে রমজানের ইবাদত করার তৌফিক দান করুন। আমিন।

Leave a Comment