সুন্নতের আলোকে রোজা পালনের মূল ভিত্তি হলো রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর শেখানো পদ্ধতির হুবহু অনুকরণ করা। এর মধ্যে অন্যতম হলো ফজরের আজানের একেবারে কাছাকাছি সময়ে সাহরী খাওয়া এবং সূর্যাস্তের সাথে সাথেই বিলম্ব না করে ইফতার করা। ইফতারিতে বেজোড় সংখ্যক খেজুর বা পানি দিয়ে শুরু করা এবং পরিমিত খাবার গ্রহণ করা সুন্নাত। এছাড়াও রমজান মাসে দান-সদকা বাড়ানো, কোরআন তেলাওয়াত এবং দীর্ঘ সময় নিয়ে কিয়ামুল লাইল বা তারাবিহ আদায় করা একজন রোজাদারের জন্য সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ আমল।
সাহরী ও ইফতারের সুন্নাত পদ্ধতি এবং সময়
রমজান মাসে আমাদের এবাদতগুলো নিজের ইচ্ছামতো নয়, বরং সুন্নাত অনুযায়ী হতে হবে। অতিরিক্ত সওয়াবের আশায় আগে থেকে রোজা শুরু করা বা দেরিতে ইফতার করার কোনো সুযোগ ইসলামে নেই। নিচে সাহরী ও ইফতারের সঠিক সুন্নাত পদ্ধতি ধাপে ধাপে আলোচনা করা হলো:
সাহরী খাওয়ার সঠিক নিয়ম
- শেষ সময়ে সাহরী করা: সাহরী খাওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সুন্নাত হলো এটিকে যথাসম্ভব ফজরের আজানের কাছাকাছি সময়ে নিয়ে যাওয়া।
- পরিমিত আহার: সারাদিন না খেয়ে থাকতে হবে ভেবে রাতে অতিরিক্ত খাবার গ্রহণ করা সুন্নাতের পরিপন্থী; বরং সাহরীতে অল্প ও স্বাভাবিক খাবার গ্রহণ করা উচিত যা সিয়াম পালনে সাহায্য করবে।
ইফতারের সুন্নাত ও আদব
- দ্রুত ইফতার করা: সূর্য অস্ত যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইফতার করা সুন্নাত, এক্ষেত্রে কোনোভাবেই বিলম্ব করা উচিত নয়।
- খেজুর বা পানি দিয়ে ইফতার: রাসূলুল্লাহ (সা.) টাটকা বা শুকনো খেজুর দিয়ে ইফতার করতেন এবং খেজুর না পেলে পানি দিয়ে ইফতার শুরু করতেন। বাংলাদেশে যুগ যুগ ধরে প্রথমে পানি মুখে দিয়ে ইফতার শুরু করার যে প্রচলন রয়েছে, তা সুন্নাতেরই একটি অংশ। তবে সামর্থ্য থাকলে খেজুর দিয়েই ইফতার শুরু করা উত্তম।
- মাগরিবের সালাত আদায়: ইফতারের সময় আহারের যে তীব্র আকাঙ্ক্ষা থাকে, তা সামান্য কিছু খেয়ে নিবৃত্ত করার পর মাগরিবের সালাত আদায় করা সুন্নাত।
ইফতারের সময় পড়ার দোয়া
ইফতারের সময় রাসূলুল্লাহ (সা.) আল্লাহর কাছে দোয়া করতেন। এর মধ্যে একটি প্রসিদ্ধ দোয়া হলো “যাহাবায যামাউ ওয়াবতাল্লাতিল উরূকু ওয়া সাবাতাল আজরু ইনশাআল্লাহ” (পিপাসা চলে গেল, শিরা-উপশিরা সিক্ত হলো এবং আল্লাহর ইচ্ছায় সওয়াব নির্ধারিত হলো)।
সিয়ামরত অবস্থায় করণীয় অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ আমল
রোজা রাখা মানে শুধু পানাহার থেকে বিরত থাকা নয়, বরং এই মাসে আরও কিছু বিশেষ আমল রয়েছে:
- দান-সদকা বৃদ্ধি করা: রাসূলুল্লাহ (সা.) এমনিতে দানশীল ছিলেন, তবে রমজান মাসে তাঁর দান ও বদান্যতা বহুগুণ বেড়ে যেত এবং তিনি সবাইকে সাহায্য করতে উদ্গ্রীব থাকতেন।
- দীর্ঘ কিয়ামুল লাইল (তারাবীহ): রমজানের রাতে কিয়ামুল লাইল আদায় করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের সমাজে কত রাকাত তারাবিহ পড়া হবে তা নিয়ে অনেক বিতর্ক থাকলেও, দীর্ঘ সময় (৩-৬ ঘণ্টা) দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ার যে মূল সুন্নাত, সেদিকে আমরা প্রায়ই গুরুত্ব দেই না।
- রমজানে ওমরাহ পালন: রমজান মাসে ওমরাহ পালন করলে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সাথে হজ্জ আদায়ের সমপরিমাণ সওয়াব পাওয়া যায়।
- কোরআন তেলাওয়াত: রমজানে বেশি বেশি কোরআন পড়া এবং খতম করা একটি মুস্তাহাব আমল।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
রোজাদারকে ইফতার করানোর সওয়াব কী?
কেউ যদি কোনো রোজাদারকে ইফতার করায়, তবে তিনি সারাদিন রোজা রেখে যে সওয়াব পেলেন, ইফতার করানো ব্যক্তিও ঠিক সমপরিমাণ সওয়াব লাভ করবেন। এতে মূল রোজাদারের সওয়াব বিন্দুমাত্র কমবে না।
আজানের জবাব আগে দিবো নাকি ইফতার করবো?
এই দুটির মধ্যে কোনো বৈপরীত্য নেই। আজান শুরু হওয়ার সাথে সাথে একটি খেজুর বা পানি মুখে দিয়ে ইফতার শুরু করে, এরপর চুপ থেকে আজানের জবাব দেওয়া যায়।
রোজার অবস্থায় মেসওয়াক করা যাবে কি?
হ্যাঁ, সিয়ামরত অবস্থায় কাঁচা বা শুকনো ডাল দিয়ে মেসওয়াক করা সুন্নাত। তবে খেয়াল রাখতে হবে মেসওয়াকের কোনো অংশ যেন পেটে চলে না যায়।
তাহাজ্জুদ ও কিয়ামুল লাইল-এর মধ্যে পার্থক্য কী?
রাতের বেলায় ঘুমানোর আগে বা পরে যেকোনো সময় নামাজ পড়লেই তা কিয়ামুল লাইল। তবে এশার নামাজের পর ঘুমিয়ে, তারপর রাতে উঠে যে কিয়ামুল লাইল আদায় করা হয়, সেটিই তাহাজ্জুদ হিসেবে গণ্য হয়।
তথ্যসূত্র (Source): ড. খন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর (রহ.) এর লেকচার।
ডিসক্লেইমার (Disclaimer): এই আর্টিকেলটি শুধুমাত্র সাধারণ ইসলামিক জ্ঞান ও তথ্য শেয়ার করার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে। আমরা সুন্নাহ এবং হাদিসের তথ্যগুলো নির্ভুলভাবে তুলে ধরার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। তবে, রোজা, সাহরী, ইফতার বা অন্য কোনো ইবাদতের বিষয়ে আপনার কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিগত মাসআলা বা ফতোয়া জানার প্রয়োজন হলে, অবশ্যই আপনার নিকটস্থ কোনো নির্ভরযোগ্য মুফতি বা বিজ্ঞ আলেমের শরণাপন্ন হওয়ার অনুরোধ করা হলো।