রোজা রেখে দাড়ি বা চুল কাটা যাবে কি?

হ্যাঁ, রোজা রেখে চুল কাটা, দাড়ি ছাঁটা এবং নখ কাটা সম্পূর্ণ জায়েজ। এতে রোজা ভাঙে না। তবে দাড়ি সম্পূর্ণ শেভ করা (কামানো) রোজার ক্ষতি না করলেও, এটি নবীজি (সা.)-এর সুন্নতের বিপরীত বলে ইসলামি আলেমরা সর্বদা নিরুৎসাহিত করেন।

রমজান মাস এলেই বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ মুসলিম মনে একটি সাধারণ প্রশ্ন আসে রোজা থেকে কি দাড়ি কাটা যাবে? রোজা রেখে চুল কাটালে কি রোজা নষ্ট হয়ে যায়? অনেকে এই বিষয়ে ভুল ধারণার কারণে প্রয়োজনীয় কাজটুকুও করেন না। এই আর্টিকেলে আমরা ইসলামি শরিয়তের আলোকে এই প্রশ্নের সঠিক ও বিস্তারিত উত্তর দেব।

রোজা ভঙ্গের আসল কারণ কী?

রোজা ভাঙার কারণ বোঝা না থাকলে অনেক ভুল ধারণা জন্ম নেয়। ইসলামি ফিকহ অনুযায়ী, রোজা মূলত নষ্ট হয় নিম্নোক্ত কারণে:

  • পানাহার: ইচ্ছাকৃতভাবে কিছু খাওয়া বা পান করা
  • রতিক্রিয়া: স্বামী-স্ত্রীর শারীরিক সম্পর্ক
  • ইচ্ছাকৃত বমি: জেনেশুনে বমি করা
  • ইনজেকশন বা স্যালাইন: পুষ্টিকর দ্রব্য সরাসরি রক্তে প্রবেশ করালে (অধিকাংশ আলেমের মত)

চুল কাটা, নখ কাটা বা দাড়ি ছাঁটা এর কোনোটিই রোজা ভঙ্গের কারণ নয়।

রোজা রেখে চুল কাটা যাবে কি?

হ্যাঁ, রোজা রেখে মাথার চুল কাটা সম্পূর্ণ জায়েজ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শামছুল আলম স্পষ্টভাবে বলেছেন, “নখ, চুল কাটা যাবে না এটা একদম ভুল কথা।” তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, চুল বা নখে রক্ত প্রবাহিত হয় না, এবং এগুলো কাটার সঙ্গে রোজার কোনো সম্পর্কই নেই।

রমজানে রোজা রেখে দিনের বেলায় যা করা যাবে:

  • মাথার চুল কাটা বা কাটানো
  • হাত-পায়ের নখ কাটা
  • মোচ ছাঁটা
  • শরীরের অবাঞ্ছিত লোম পরিষ্কার করা
  • ক্ষৌরকর্ম (শেভিং) করা বা করানো

এসব কাজ করলে রোজার কোনো ক্ষতি হবে না।

দাড়ি কাটলে কি রোজা ভঙ্গ হয়?

না, দাড়ি কাটলে রোজা ভঙ্গ হয় না।

শায়খ মাহমুদুল হাসানসহ একাধিক ইসলামি আলেম বলেছেন, রোজা রেখে দাড়ি সেভ করলেও রোজা ভাঙবে না। রোজা তার নিজের জায়গায় আদায় হয়ে যাবে।

তবে এখানে দুটো বিষয় আলাদা করে বোঝা দরকার:

১. রোজা ভাঙে কিনা: না, ভাঙে না। দাড়ি কামানো রোজা ভঙ্গের কারণ নয়।

২. শরিয়তের দৃষ্টিতে দাড়ি কামানো কি উচিত: দাড়ি রাখা নবীজি (সা.)-এর সুন্নত। অনেক আলেমের মতে এটি ওয়াজিব বা অন্তত মুস্তাহাব। তাই রমজান বা যেকোনো সময়ে দাড়ি কামানো উচিত নয়। রমজানে এটি করলে রোজার পূর্ণ উদ্দেশ্য অর্থাৎ আল্লাহ ও রাসুল (সা.)-এর পরিপূর্ণ আনুগত্য অর্জিত হয় না।

সংক্ষেপে: দাড়ি কাটলে রোজা ভাঙে না, কিন্তু দাড়ি কামানো (শেভ করা) সুন্নতের বিরোধী এই দুটো বিষয় গুলিয়ে ফেলা উচিত নয়।

রোজার হেয়ার কাট করা যাবে কি?

হেয়ার কাট বা সেলুনে গিয়ে চুল কাটানো রোজায় সম্পূর্ণ বৈধ। এ বিষয়ে শরিয়তে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। রোজা অবস্থায় সেলুনে গিয়ে চুল কাটালে রোজার কোনো ক্ষতি হবে না।

তবে একটি বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে চুল কাটার সময় কোনো কিছু যেন মুখে না যায়। সেলুনে অনেক সময় পাউডার, স্প্রে বা তরল জিনিস ব্যবহার হয়, যদি সেগুলো মুখের ভেতরে চলে যায় তাহলে সতর্কতার বিষয় আছে।

রোজা অবস্থায় নখ কাটলে রক্ত বের হলে কি রোজা ভাঙে?

না। নখ বা চুল কাটতে গিয়ে রক্ত বের হলেও রোজা ভাঙে না। রক্ত বের হওয়া রোজা ভঙ্গের কারণ নয়। রোজা ভঙ্গ হয় তখন, যখন পেটের ভেতরে কিছু প্রবেশ করে শুধু রক্ত বের হওয়াতে নয়।

রমজানে কোন কাজগুলো রোজা ভেঙে দেয়?

অনেকেই রোজা ভঙ্গের বিষয়ে বিভ্রান্তিতে থাকেন। নিচে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হলো:

রোজা ভাঙে যেসব কারণে:

  • ইচ্ছাকৃতভাবে পানাহার করা
  • স্বামী-স্ত্রীর মিলন
  • ইচ্ছাকৃত বমি করা
  • পুষ্টিকর ইনজেকশন বা স্যালাইন (বিতর্কিত, তবে সাবধান থাকা উত্তম)

রোজা ভাঙে না যেসব কারণে:

  • চুল কাটা
  • নখ কাটা
  • দাড়ি ছাঁটা বা শেভ করা
  • ভুলে কিছু খেয়ে ফেলা
  • কুলি করা বা নাকে পানি দেওয়া (গলায় না যাওয়া পর্যন্ত)
  • ইনজেকশন যা পুষ্টিকর নয়
  • চোখে ড্রপ দেওয়া
  • রক্ত বের হওয়া
  • স্বপ্নদোষ হওয়া
  • মিসওয়াক বা ব্রাশ করা (টুথপেস্ট গিলে না ফেললে)

দাড়ি সম্পর্কে ইসলামের বিধান কী?

এই প্রশ্নটি রোজার সাথে সম্পর্কিত না হলেও অনেকেই জানতে চান। ইসলামে দাড়ি রাখা নবীজি (সা.)-এর সুন্নত। হাদিসে বলা হয়েছে, মোচ ছেঁটে রাখতে এবং দাড়ি লম্বা রাখতে।

হানাফি মাযহাব অনুযায়ী (যা বাংলাদেশের অধিকাংশ মুসলিম অনুসরণ করেন), এক মুষ্টি পরিমাণ দাড়ি রাখা ওয়াজিব এবং এর কম করা নিষিদ্ধ। তবে এর অর্থ এই নয় যে দাড়ি কামালে রোজা ভাঙবে রোজা তার জায়গায় আদায় হবে, কিন্তু আলাদাভাবে সুন্নতের বিরোধিতার গুনাহ হবে।

রমজানে কোন কাজগুলো এড়িয়ে চলা উচিত?

রোজা না ভাঙলেও রমজানের মর্যাদা রক্ষায় কিছু কাজ থেকে বিরত থাকা উচিত:

  • মিথ্যা বলা ও গিবত করা
  • অশ্লীল কথাবার্তা ও ঝগড়া-বিবাদ
  • রিয়া বা লোক দেখানো ইবাদত
  • অপচয় ও অপব্যয়
  • দেরিতে ইফতার করা বা সাহরি না খাওয়া
  • বেশি বেশি ঘুমানো ও সময় নষ্ট করা

সচরাচর জিজ্ঞাসা

রোজা থেকে দাড়ি কাটা যাবে কি?

হ্যাঁ, রোজা থেকে দাড়ি ছাঁটা যাবে এবং এতে রোজার কোনো ক্ষতি হবে না। তবে দাড়ি সম্পূর্ণ শেভ করা (কামানো) সুন্নতের বিপরীত, যা রোজার বাইরেও সর্বদা নিরুৎসাহিত।

রোজা রেখে চুল কাটা যাবে কি?

হ্যাঁ, রোজা রেখে চুল কাটা সম্পূর্ণ জায়েজ। ইসলামি শরিয়তে এ বিষয়ে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই।

দাড়ি কাটলে কি রোজা ভঙ্গ হয়?

না, দাড়ি কাটলে রোজা ভঙ্গ হয় না। রোজা ভাঙে মূলত পানাহার ও রতিক্রিয়ার মাধ্যমে।

রোজার হেয়ার কাট করা যাবে কি?

হ্যাঁ, রোজা রেখে সেলুনে গিয়ে হেয়ার কাট করা সম্পূর্ণ বৈধ। এতে রোজার কোনো ক্ষতি হয় না।

রোজা রেখে নখ কাটা যাবে কি?

হ্যাঁ, রোজা রেখে নখ কাটা জায়েজ। এমনকি নখ কাটতে গিয়ে রক্ত বের হলেও রোজা ভাঙে না।

রোজা অবস্থায় শেভ করলে কি রোজা ভাঙে?

না, শেভ করলে রোজা ভাঙে না। তবে দাড়ি শেভ করা সুন্নতের বিরোধী বলে আলেমরা সতর্ক করেন।

রোজায় চুল কাটলে কি গুনাহ হয়?

রোজায় চুল কাটা গুনাহ নয়, বরং এটি সম্পূর্ণ জায়েজ। রোজা ভাঙার কারণগুলোর সঙ্গে চুল কাটার কোনো সম্পর্ক নেই।

রমজানে মোচ ছাঁটা যাবে কি?

হ্যাঁ, রোজা রেখে মোচ ছাঁটা সম্পূর্ণ বৈধ। বরং মোচ ছাঁটা সুন্নত।

শেষকথা

রোজা থেকে চুল কাটা, দাড়ি ছাঁটা, নখ কাটা বা হেয়ার কাট করা সবই সম্পূর্ণ জায়েজ। এতে রোজা ভাঙে না। এই বিষয়ে প্রচলিত ভুল ধারণাগুলো সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।

তবে দাড়ি সম্পূর্ণ কামানো (শেভ করা) সুন্নতের বিপরীত বলে ইসলামি আলেমরা সর্বদা নিরুৎসাহিত করেন তবে এটি রোজার সঙ্গে নয়, বরং দাড়ি রাখার সুন্নতের সঙ্গে সম্পর্কিত।

রমজানের মূল লক্ষ্য হলো আল্লাহর পরিপূর্ণ আনুগত্য ও তাকওয়া অর্জন করা। তাই এই মাসে বৈধ কাজগুলো করার পাশাপাশি ইবাদত, কোরআন তেলাওয়াত ও নেক আমলে বেশি মনোযোগ দিন।

সূত্র ও তথ্যসূত্র:

  • ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ
  • শায়খ মাহমুদুল হাসান (ইসলামি স্কলার)
  • শায়খ মুহাম্মদ সাইফুল্লাহ
  • Dhaka Post, Jago News24, Dhaka Tribune ইসলামিক বিশেষজ্ঞদের মতামত।

Leave a Comment