সামনে নির্বাচন, আর আপনার ওপর কি পোলিং অফিসারের দায়িত্ব পড়েছে? অথবা সাধারণ ভোটার হিসেবে জানতে চান ভোটকেন্দ্রে কার কী কাজ? নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে প্রিজাইডিং অফিসারের পরেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন পোলিং অফিসার। চলুন জেনে নিই একজন পোলিং অফিসারের কাজ এবং ক্ষমতা সম্পর্কে বিস্তারিত।
পোলিং অফিসারের কাজ কি?
পোলিং অফিসারের (Polling Officer) মূল কাজ হলো ভোটকক্ষে প্রবেশ করা ভোটারের পরিচয় শনাক্ত করা, ভোটার তালিকায় তার নাম খুঁজে বের করা, বাম হাতের আঙুলে অমোচনীয় কালি (Indelible Ink) লাগানো এবং ভোট প্রদানের জন্য ব্যালট পেপার ইস্যু করা বা ইভিএমের (EVM) অ্যাক্সেস দেওয়া। তিনি মূলত সহকারী প্রিজাইডিং অফিসারের নির্দেশনায় কাজ করেন।
একজন পোলিং অফিসারের বিস্তারিত দায়িত্ব
বাংলাদেশে জাতীয় বা স্থানীয় নির্বাচনে সাধারণত একটি ভোটকক্ষে (Polling Booth) ২ জন পোলিং অফিসার এবং ১ জন সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার থাকেন। দায়িত্ব পালনের সুবিধার্থে পোলিং অফিসারদের কাজের সুনির্দিষ্ট ভাগ থাকে।
১. প্রথম পোলিং অফিসারের কাজ (ভোটার শনাক্তকরণ)
ভোটার যখন কক্ষে প্রবেশ করেন, তিনি প্রথমে প্রথম পোলিং অফিসারের কাছে যান। তার কাজগুলো হলো:
- পরিচয় যাচাই: ভোটারের এনআইডি (NID), স্মার্ট কার্ড বা ভোটার স্লিপ দেখে তালিকা অনুযায়ী তার পরিচয় নিশ্চিত করা।
- নাম ঘোষণা: উচ্চস্বরে ভোটারের নাম ও ক্রমিক নম্বর পড়া, যাতে পোলিং এজেন্টরা শুনতে পান এবং তাদের তালিকা থেকে নাম কেটে দিতে পারেন।
- তালিকা মার্কিং: ভোটার তালিকার মূল কপিতে ওই ভোটারের নামের নিচে বা পাশে লাল কালির দাগ দেওয়া (পুরুষ ও মহিলার ক্ষেত্রে ভিন্ন নিয়ম হতে পারে)।
২. দ্বিতীয় পোলিং অফিসারের কাজ (কালি ও ব্যালট)
পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর ভোটার দ্বিতীয় পোলিং অফিসারের কাছে আসেন। তার কাজগুলো হলো:
- কালি লাগানো: ভোটারের বাম হাতের তর্জনীতে বা বৃদ্ধাঙ্গুলিতে অমোচনীয় কালি (Indelible Ink) এমনভাবে লাগানো যাতে তা চামড়া ও নখের সংযোগস্থলে লাগে। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
- স্বাক্ষর বা টিপসই গ্রহণ: ব্যালট পেপারের মুড়িতে (Counterfoil) ভোটারের স্বাক্ষর বা বৃদ্ধাঙ্গুলির ছাপ নেওয়া।
- ব্যালট ইস্যু/ইভিএম: পেপার ব্যালট হলে ব্যালট পেপার ছিঁড়ে ভোটারের হাতে দেওয়া। আর যদি ইভিএম (EVM) ব্যবহার হয়, তবে কন্ট্রোল ইউনিটের মাধ্যমে ভোটারের জন্য গোপন কক্ষে ব্যালট ইউনিট সচল করে দেওয়া।
ইভিএম বনাম পেপার ব্যালট:
নির্বাচন পদ্ধতিভেদে পোলিং অফিসারের কাজে কিছুটা ভিন্নতা আসে। নিচে একটি তুলনামূলক ছক দেওয়া হলো:
| কাজের ধরণ | পেপার ব্যালট পদ্ধতি | ইভিএম (EVM) পদ্ধতি |
| মূল দায়িত্ব | ব্যালট পেপারের পেছনে সিল ও স্বাক্ষর দেওয়া এবং ভোটারকে হস্তান্তর করা। | মেশিনের ‘ব্যালট’ বাটন চেপে ভোটারকে ভোট দেওয়ার অনুমতি দেওয়া। |
| সতর্কতা | খেয়াল রাখা যেন ভোটার ব্যালট নিয়ে বাইরে না চলে যান। | খেয়াল রাখা যেন ভোটার মেশিনের ক্ষতি না করেন বা একাধিক চাপ না দেন। |
| সময় ব্যবস্থাপনা | ব্যালট ভাঁজ করতে শেখানো। | ডিজিটাল স্ক্রিনে প্রতীক নিশ্চিত করতে সাহায্য করা। |
পোলিং অফিসার ও প্রিজাইডিং অফিসারের পার্থক্য কী?
অনেকেই এই পদগুলো গুলিয়ে ফেলেন। আসুন পরিষ্কার হই:
- প্রিজাইডিং অফিসার (Presiding Officer): তিনি পুরো ভোটকেন্দ্রের প্রধান। সকল আইন-শৃঙ্খলা ও ফলাফলের দায়িত্ব তার।
- সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার (Assistant Presiding Officer): তিনি একটি নির্দিষ্ট বুথ বা কক্ষের দায়িত্বে থাকেন। পোলিং অফিসাররা তার অধীনে কাজ করেন।
- পোলিং অফিসার (Polling Officer): তারা সরাসরি ভোটারের সাথে ইন্টারেক্ট করেন এবং ভোট গ্রহণে সহায়তা করেন।
পোলিং অফিসারের জন্য যা করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ
সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে পোলিং অফিসারকে অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হয়।
- কোনো ভোটারের ভোট কাকে দিচ্ছেন তা দেখার চেষ্টা করা যাবে না (গোপনীয়তা লঙ্ঘন)।
- কোনো নির্দিষ্ট প্রার্থীর পক্ষে বা বিপক্ষে কথা বলা যাবে না।
- ভোটারকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করা যাবে না।
- প্রিজাইডিং অফিসারের অনুমতি ছাড়া বুথ ত্যাগ করা যাবে না।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
প্রশ্ন: পোলিং অফিসারদের কি ভোট নেওয়ার আগে কোনো ট্রেনিং দেওয়া হয়?
উত্তর: হ্যাঁ, বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন (EC) নির্বাচনের কয়েকদিন আগে প্রিজাইডিং এবং পোলিং অফিসারদের জন্য দিনব্যাপী প্রশিক্ষণের আয়োজন করে। সেখানে ইভিএম ব্যবহার এবং আইনকানুন হাতে-কলমে শেখানো হয়।
প্রশ্ন: পোলিং অফিসার হিসেবে কারা নিয়োগ পান?
উত্তর: সাধারণত সরকারি স্কুল-কলেজের শিক্ষক, ব্যাংক কর্মকর্তা এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের এই পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। রিটার্নিং অফিসার এই নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন।
প্রশ্ন: পোলিং অফিসার কি নিজের ভোট দিতে পারেন?
উত্তর: অবশ্যই। তবে যেহেতু তারা ভোটের দিন ডিউটিতে থাকেন, তাই তারা সাধারণত পোস্টাল ব্যালট (Postal Ballot)-এর মাধ্যমে আগেই ভোট প্রদান করেন।
প্রশ্ন: পোলিং অফিসারদের সম্মানী কত দেওয়া হয়?
উত্তর: এটি নির্বাচনভেদে (জাতীয় বা স্থানীয়) ভিন্ন হয়। তবে যাতায়াত ও খাওয়া বাবদ নির্বাচন কমিশন একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ সম্মানী ভাতা প্রদান করে।
শেষ কথা
একজন পোলিং অফিসার শুধুমাত্র একজন নির্বাচনী কর্মী নন, তিনি গণতন্ত্রের একজন প্রহরী। তার সততা এবং দক্ষতার ওপরই নির্ভর করে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন। আপনি যদি ভবিষ্যতে এই দায়িত্ব পান, তবে মনে রাখবেন আপনার আঙুলের ইশারায় নয়, বরং আপনার নিরপেক্ষতায় একটি সঠিক সরকার গঠিত হতে পারে।