বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকলে কি সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়া যায়? ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচন কমিশনের (EC) আপিল শুনানিতে দেখা যাচ্ছে, অনেক প্রার্থীর মনোনয়ন এই একটি কারণেই বাতিল হচ্ছে। আজ আমরা সহজ ভাষায় এই আইনি জটিলতা এবং এর সমাধান নিয়ে আলোচনা করব।
নির্বাচনে কি দ্বৈত নাগরিকরা প্রার্থী হতে পারেন?
সহজ উত্তর হলো—না। বাংলাদেশের সংবিধান ও আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তির যদি অন্য কোনো দেশের নাগরিকত্ব থাকে বা তিনি অন্য কোনো দেশের প্রতি আনুগত্য স্বীকার করেন, তবে তিনি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার যোগ্য নন। প্রার্থী হতে হলে তাকে অবশ্যই বাংলাদেশের নাগরিক হতে হবে এবং অন্য দেশের নাগরিকত্ব আইনত ত্যাগ করতে হবে।
সংবিধান ও গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (RPO) কী বলে?
বাংলাদেশের নির্বাচনী আইনের মূল ভিত্তি দুটি জায়গার ওপর দাঁড়িয়ে:
১. সংবিধানের ৬৬ (২) (গ) অনুচ্ছেদ: এখানে স্পষ্ট বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি যদি কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জন করেন বা বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করেন, তবে তিনি সংসদের সদস্য হওয়ার অযোগ্য হবেন।
২. গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (RPO): নির্বাচন কমিশন এই আইন অনুযায়ী প্রার্থীদের মনোনয়ন যাচাই-বাছাই করে। দ্বৈত নাগরিকত্ব গোপন করা আইনি অপরাধ এবং এর ফলে প্রার্থীতা আজীবনের জন্য ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
২০২৬ নির্বাচনের সাম্প্রতিক চিত্র: কেন অনেকের মনোনয়ন বাতিল হচ্ছে?
২০২৬ সালের নির্বাচনে বেশ কয়েকজন হেভিওয়েট প্রার্থীর মনোনয়ন দ্বৈত নাগরিকত্বের কারণে বাতিল করেছে ইসি। সাম্প্রতিক আপিল শুনানির তথ্য অনুযায়ী:
- কুমিল্লা-১০ আসন: দ্বৈত নাগরিকত্বের অভিযোগে বিএনপি প্রার্থী আব্দুল গফুর ভূঁইয়ার মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে।
- চট্টগ্রাম-২ আসন: একই অভিযোগে বিএনপি প্রার্থী সারোয়ার আলমগীরের প্রার্থিতাও বাতিল করেছে নির্বাচন কমিশন।
- ব্যতিক্রম: অন্যদিকে, অনেকে দ্বৈত নাগরিকত্ব সঠিক সময়ে ত্যাগ করার প্রমাণ দেখিয়ে তাদের প্রার্থিতা ফিরেও পেয়েছেন। আবার কারো কারো ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলের ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকলেও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়াই করার সুযোগ বহাল রাখা হয়েছে, যেমনটা দেখা গেছে লতিফ সিদ্দিকীর ক্ষেত্রে।
দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকলে কি প্রার্থী হওয়ার কোনো উপায় আছে?
যদি কোনো প্রবাসী বা দ্বৈত নাগরিক বাংলাদেশে নির্বাচন করতে চান, তবে তাকে নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করতে হবে:
- নাগরিকত্ব ত্যাগ (Renunciation): সংশ্লিষ্ট দেশের আইন অনুযায়ী আনুষ্ঠানিকভাবে নাগরিকত্ব ত্যাগ করতে হবে।
- সার্টিফিকেট সংগ্রহ: নাগরিকত্ব ত্যাগের সরকারি সনদ বা প্রমাণপত্র থাকতে হবে।
- মনোনয়নের আগে নিষ্পত্তি: কেবল নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদন করলেই হবে না, মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার আগেই সেই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে হবে।
সাধারণ মানুষের জন্য এর গুরুত্ব ও প্রভাব
নির্বাচনে দ্বৈত নাগরিকত্বের এই কড়াকড়ি শুধুমাত্র আইনের বিষয় নয়, এটি রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্যের একটি বড় পরীক্ষা। ভোটাররা চান এমন প্রতিনিধি, যার একমাত্র দায়বদ্ধতা থাকবে বাংলাদেশের প্রতি। তাই প্রার্থীরা যখন নাগরিকত্ব গোপন করেন, তা সাধারণ মানুষের আস্থার পরিপন্থী হিসেবে দেখা হয়।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
১. দ্বৈত নাগরিকরা কি বাংলাদেশে ভোট দিতে পারেন?
হ্যাঁ, দ্বৈত নাগরিকরা ভোটার তালিকায় নাম থাকলে ভোট দিতে পারেন, কিন্তু নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারেন না।
২. নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদন করলেই কি প্রার্থী হওয়া যায়?
না, কেবল আবেদন যথেষ্ট নয়। নির্বাচন কমিশনের শুনানিতে প্রমাণিত হতে হবে যে তিনি আইনত ওই দেশের নাগরিকত্ব থেকে মুক্ত হয়েছেন।
৩. দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকলে কি স্থানীয় সরকার (যেমন- মেয়র বা কাউন্সিলর) নির্বাচনে অংশ নেওয়া যায়?
না, বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও দ্বৈত নাগরিকদের অংশগ্রহণে বিধিনিষেধ রয়েছে।
কনটেন্ট সোর্স ও তথ্যসূত্র:
- বাংলাদেশের সংবিধান (অনুচ্ছেদ ৬৬)
- নির্বাচন কমিশন (EC) আপিল শুনানি রিপোর্ট ২০২৬